নিচের লেখাটি মৈনাকের। আমি স্রেফ ওর ইংরেজি হরফগুলিকে বাংলায় লিখেছি, আর কিছু যতিচিহ্ন পরিবর্তন করেছি।
------------------------------ ---------------
নিজেকে কখনোই জাত গল্পকথক হিসেবে দাবি করি নাই, বাচালপনাও কখনো করিয়াছি বলিয়া মনে পড়ে না। তবুও বৃষ্টি হইলে গল্প করিতে ইচ্ছা হয় -- মজার, অদ্ভুতুড়ে কিম্বা রহস্য গল্প। আমি একলা মানুষ, গল্প করিবার লোক নাই, তাই আপনাদের বারবার বিরক্ত করিয়া থাকি। সবার জীবনেই কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা রহিয়াছে যাহা অন্যের সহিত ভাগ করিয়া লইলে সাময়িক আনন্দপ্রাপ্তি ঘটে, যাহারা একগাদা সময় লইয়া বসিয়া আছেন কিছুই করিবার নাই তাহাদের জন্যে আজকের গল্পটি। অভিজ্ঞতা অনেক ভাবে অর্জন করা যায়, মূলতঃ পাঁচটি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা, এইটি আমার শ্রবনেন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রাপ্ত, কাজেই একে ঠিক "সত্য ঘটনা অবলম্বনে" শ্রেণীতে ফেলা যায় না।
গণিত লইয়া পড়াশুনা করার কারণে বেশ কিছু গণিতজ্ঞের সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য (বা দুর্ভাগ্য) আমার হইয়াছে। এই গল্পের নায়কও এক উঠতি সম্ভাবনাময় গণিতজ্ঞ, ঠিক কিভাবে তাহার অল্পের জন্যে Fields (ফিল্ডস) পুরস্কারটি হাতছাড়া হইয়াছিল আজ তারই বিবরণ করিব। এইখানে বলিয়া রাখি, "ফিল্ডস মেডেল"-কে বলা হয় গণিতের নোবেল পুরস্কার। গণিত বিশারদরা অনেক সময় তাচ্ছিল্যের সুরে বলিয়া থাকেন যে "কি আর করবো ভায়া, যে বিষয়ে গবেষণা করি তাতে তো আর আমাদের নোবেল দেওয়া হয় না", যেন নোবেল দেওয়া হইলেই তিনি পাইতেন, শুধু দেওয়া হয়না বলিয়াই আজ পর্যন্ত তাহার কোনো পুরস্কার কপালে জোটে নাই। যাহা হউক, তবুও সত্য অস্বীকার করা যায় না, গণিত বিভাগে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার রীতি নাই, এই জন্যে গণিতজ্ঞেরা নিজদিগকে বেশ খানিক পৃথক জ্ঞান করিয়া থাকেন।
আমার এই মিত্র গণিতজ্ঞটি তখন ভারতের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পাঠ্যরত। সময়টা এই শতকের প্রথম দিক, তখনো ইন্টারনেট এতো বারোয়ারী হয় নাই, লাইব্রেরিতেই ছাত্রেরা বই-খাতা-কলম সহযোগে পড়াশুনা করিত। আমরা অনেকেই জানি যে স্নাতকোত্তর বিজ্ঞান বিভাগে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই "ফাইনাল ইয়ার প্রোজেক্ট" বলিয়া একটি বস্তু আছে। যাহারা B.Tech করিয়াছেন তাহারা সহজেই ব্যাপারটি ধরিতে পারিবেন। যাহারা করেন নাই, তাহাদের জন্যে বলিয়া রাখি, ইহাকে খানিকটা উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তিপ্রাপ্তির সহিত তুলনা করা যায়, সুসন্তান ও কুসন্তান সবাই সম্পত্তির অধিকারী, সকলকে সন্তুষ্ট করিয়া কোর্স শেষ করাই সম্ভবত এই বিষয়টিকে পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার একমাত্র কারণ বলিয়া ঠাহর হয়। বেকায়দার কোনো অধ্যাপকের খপ্পরে না পড়িলে, কখনো কেহ এই প্রোজেক্ট যত্ন সহকারে সৎভাবে করিয়াছে বলিয়া শোনা যায় না। তবুও এটি আছে। এই প্রোজেক্ট শেষে ছাত্রটিকে সর্বসমক্ষে একটি presentation দিতে হয়।.সাধারণতঃ সকলে এই বিষয়ে বেশ ভালো নম্বর পাইয়া থাকে। এই প্রোজেক্ট কোনো এক অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে এক সেমিস্টার (কখনো বা এক বৎসর) যাবৎ করিতে হয়, অধিকাংশ সময়ে অধ্যাপকটি পরীক্ষার দিন ছাত্রটিকে প্রথমবার দেখিতে পান, এবং তার presentation-এ নিজের নাম দেখিয়া কিঞ্চিৎ বিস্মিত হন। এমনি এক প্রোজেক্ট লইয়াছিল আমার গণিতজ্ঞ বন্ধুটি, তাহাদিগের গণিত বিভাগের Pure Mathematics-এর এক অধ্যাপকের নিকট। এই অধ্যাপকটি খুব নামজাদা কেহ নহে, তবে তার হাতে নম্বর পাওয়া বেশ সহজ বলিয়া ছাত্রদের তাহার দিকে ঝোঁক কিঞ্চিৎ বেশি ছিল। সেমিস্টার শুরুর সময় এই অধ্যাপক আমার বন্ধুটিকে অজ্ঞাত কোনো বই থেকে একটি প্রবলেম দিয়া বলেন যে এই প্রবলেমটি উদ্ধার করিতে পারিলেই তাহার ফাইনাল ইয়ার প্রোজেক্ট খতম। আমার বন্ধুটির জানা ছিল না যে ওই প্রবলেমটি আসলে বিশ্বের ২০টি অসমাধিত (unsolved) প্রবলেমের মধ্যে একটি, যেটি সমাধান করিতে পারিলে তাহার ফিল্ডস মেডেল আটকায় কার বাপের সাধ্যি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা অধ্যাপকটিও এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তবু ভালো ব্যাপার এই যে বন্ধুটি এ ব্যাপারে অজ্ঞাত থাকাতে সে কয়েকটি বই লইয়া লাইব্রেরিতে বসিয়া কয়েকবার প্রবলেমটি সমাধান করার চেষ্টাও করিয়াছিল। সত্যিকারের অসমাধিত প্রবলেম দিয়াছে জানিলে হয়তো সে তত্ক্ষণাৎ মূর্ছা যাইতো। এই অসমাধিত প্রবলেমগুলি আবার আকারে প্রকারে গ্রাম্য তরুণীর ন্যায় সরল হয়, দেখিলেই মনে হয় নির্জনে একটু আলাপ করিলেই সমস্তটা বুঝিতে পারিব কিন্তু আদতে বিশ্বের দুঁদে গণিত বিশেষজ্ঞরা শতাব্দী যাবৎ চেষ্টা করিয়াও তা সমাধান করিতে পারে নাই। যাহা হউক, আমার বন্ধুটি কয়েকবার চেষ্টা করিয়া বিফল হইয়া শেষে ক্ষান্ত হয় এবং সেমিস্টার শেষে কিছু একটা প্রোগ্রাম লিখিয়া প্রবলেমটি যে কয়েকটি ক্ষেত্রে সিদ্ধ হইতেছে তাহা দেখাইয়া কয়েক পাতা presentation তৈরী করিয়া অধ্যাপকদের বাহবা লাভ করে। বেশ একটি সম্মানীয় নম্বর লইয়া স্নাতকোত্তর ডিগ্রীও সম্পন্ন করে। কথায় বলে যে "ignorance is bliss"। কেহই জানিতে পারে না যে প্রবলেমটির আসল মাহাত্ম্য বা গভীরত্ব কতখানি। নিয়মমাফিক আমার বন্ধুটির নাম তাহাদের গণিত বিভাগের ওয়েবসাইটে স্নাতকোত্তীর্ণ ছাত্রদের তালিকাভুক্ত করা হয় এবং তার নামের পাশে "প্রোজেক্ট" হিসেবে সেই প্রবলেমটিও থাকে, তদুপরি "successfully completed"-ও লেখা হয়।
এর প্রায় বছরখানেক বাদে, রাশিয়ার এক অধ্যাপকের কাছ থেকে আমার বন্ধুটি একটি ইমেল পান। তাতে লেখা থাকে যে উনি "Clay Mathematical Institute"-এর একজন কর্ণধার এবং সে জানতে পারে যে ওই অসমাধিত প্রবলেমটি সমাধান করার জন্যে বেশ কয়েক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার আছে, তাই ওই অধ্যাপক প্রবলেমটি সে কিভাবে সমাধান করিয়াছে সে বিষয়ে আলোচনা করিতে ইচ্ছুক। অধ্যাপকটির আবার ধারণা হইয়াছে যে আমার মিত্রটি নিতান্তই উদার যে প্রবলেমটি সমাধান করিয়াও তার প্রাপ্য পুরস্কার দাবি করে নাই। এই ইমেলটি পাওয়ার পর আমার মিত্রের টনক নড়ে। সে বেশ ভালো করিয়া খোঁজ খবর লইয়া জানিতে পারে যে তার প্রোজেক্টটি আসলে ছিল একটি অসমাধিত প্রবলেম যেটি সে "successfully complete" করিয়াছে। কিন্তু এখন সে ওই রাশিয়ার অধ্যাপককে কি করিয়া বুঝাইবে যে সমাধান সে কেমনে করিয়াছে। এ তো একপ্রকার জাতীয় লজ্জা। ওই অধ্যাপকের ভারতীয় ছাত্র সম্পর্কে কি ধারণা হইবে তাহা ভাবিয়া সে প্রহর গুনিতে থাকে। সে কিভাবে এই সমস্যা থেকে বাহির হইয়াছিল তাহা আলোচনা করা এই গল্পের উদ্দেশ্য নহে। আমার বন্ধুর মতন নিরীহ এক গণিত বিশেষজ্ঞ যে এই প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হইতে পারে তাহাই আশ্চর্যের। আসলে যে কোনো প্রবলেমই আমাদের দেওয়া হোক না কেন, তাহাকে হালকাভাবে নেওয়াই আমাদের অভ্যাস, আমরা পরে পস্তাতে প্রস্তুত, কিন্তু সাময়িক ভাবে উতরে যাওয়াটাই আমাদের প্রধান ও প্রাথমিক উদ্দেশ্য।
"You can fool all the people some of the time, and some of the people all the time, but you cannot fool all the people all the time." -- Abraham Lincoln
No comments:
Post a Comment