Friday, February 2, 2018

লেখক: পর্ব ২৪

আমার বাবা দীর্ঘকাল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় চাকরি করেছেন। প্রায় প্রতিদিন শ'খানেক কাস্টমারের সাথে ওঁনাকে কথা বলতে হতো। যে কোনো কারণেই হোক, এই সমস্ত কাস্টমাররা ব্যাঙ্কের এই বাবুটিকে মনে রেখে দিতেন। সেই কারণে বাবার সাথে হয়তো বাজার করতে গেছি, এমন সময় পাশ থেকে আওয়াজ ভেসে আসতো: "কি স্যার, ছেলেকে নিয়ে বাজার করতে এসেছেন?" কিংবা হয়তো বাবার সাথে সেলুনে ঢুকেছি তখন কোনো অপেক্ষারত ব্যক্তি নিজে থেকে বলে উঠতেন: "এই স্যারদেরকে আগে ছেড়ে দাও।"

বাবা দেখতাম এই সব মানুষদের সাথে হেসে কথা বলতেন। ঘরের কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করতেন। ছেলের মেয়ের স্কুল কেমন চলছে, যুবক ছেলে চাকরিতে ঢুকেছে কিনা, শীতে শরীর কেমন আছে -- এরকম টুকিটাকি প্রশ্নও জিজ্ঞেস করতেন। কখনো এধরণের আলাপচারিতার অন্যথা হতে দেখিনি। এদিকে বাবার কথা শুনে আমার মনে খটকা জাগতো -- এতো লোককে বাবা চিনে রাখেন কি করে? কোনো কোনো কাস্টমার পরিচিত হয়ে উঠলেও এতো লোককে আলাদা করে মনে রাখা ওঁনার পক্ষে কি ভাবে সম্ভব?

পরে আস্তে আস্তে আসল ব্যাপারটা আমি আবিষ্কার করি। বাবার স্মৃতিশক্তির পেছনে আছে সরল একটা অঙ্ক, আরো ভালো ভাবে বললে -- পরিসংখ্যান তত্ত্ব। সামনের ব্যক্তি যদি যুবক হয় তাহলে বাবা তাঁর চাকরি জীবন কেমন চলছে এই জাতীয় প্রশ্ন করেন, মাঝবয়সী ব্যক্তি হলে ছেলেমেয়ের পড়াশুনা সম্বন্ধে জানতে চান আর বয়স্ক মানুষ দেখলে ছেলের চাকরি কিংবা মেয়ের বিয়ে নিয়ে মন্তব্য করেন। এছাড়া ইদানিং স্বাস্থ্য কেমন আছে অথবা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স নিয়ে কথা তো যে কারোর সাথেই করা যায়।

আমার নিজের ভীষণ ভুলো মন। মানুষের চেহারা মনে থাকলেও নামগুলো কিছুতেই সময়মতন মনে পড়ে না। তাই বাবার শিক্ষা আমি বহুসময় কাজে লাগাই। যেমনি আগের সপ্তাহে কলেজের এক বন্ধুর সাথে হঠাৎ বেঙ্গালুরুর রাস্তায় দেখা। দুজনেই দুজনকে দেখে চিনতে পারি। বন্ধুটি "হাই, কুনাল" বলে এগিয়ে আসে। এদিকে চার বছর একসাথে পড়া সত্ত্বেও আমি কিছুতেই তার নাম মনে করতে পারি না। তাই তাড়াতাড়ি "হাই, ব্রো! হাউ আর ইউ, ব্রো?" বলে হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিই। এভাবে আগেও বহুবার "ব্রো" কিংবা "ডুড" সম্বোধনের পেছনে নিজের অজ্ঞতা লুকিয়েছি।

তবে স্বাভাবিক ভাবেই পরিসংখ্যান তত্ত্ব অনুযায়ী সবসময় এই ধরণের কৌশল খাটে না। একবার আমার দুই সিনিয়রের সাথে ট্রেনে করে চলেছি। তিরিশ ঘন্টার জার্নি। কাঁহাতক আর চুপচাপ বসে থাকা যায়? এক সিনিয়রের বহুদিন আগে বিয়ে হয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি: "কি অমুকদা, তোমার ছেলে এখন স্কুলে যায়?" সে উত্তর দেয় যে তার কোনো ছেলে নেই। এই শুনে আমি দ্বিতীয় প্রশ্ন করি: "ও, সরি, তোমার তো মেয়ে আছে। সে এখন স্কুলে যায়?" এর উত্তরে সে বিষণ্ণ স্বরে জানায় যে তার ছেলে বা মেয়ে এই মুহূর্তে নেই তবে চেষ্টা চরিত্র চলছে।
প্রথম যাত্রায় পুরোপুরি ঘেঁটে ফেলায় আমি তখন অন্য সিনিয়রের প্রতি মনোনিবেশ করি। এই সিনিয়রের বয়েস অনেক কিন্তু অবিবাহিত। আমি: "কি তমুকদা, অনেক দিন তো হলো -- এবার বিয়েটা সেরে ফেলো। আমরা পাত পেড়ে খাই।" এর উত্তরে সে জানায় যে সে আসলে ডিভোর্সি। সেই সময় আমার বাবা-মা দাদার বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছিলো। তমুকদা তাই উল্টে মেয়ে দেখা কি সাংঘাতিক কঠিন ব্যাপার সেই নিয়ে আমার মনে ভীতি ঢুকিয়ে দিলো। দুদিক থেকেই মিস-ফায়ার হয়ে যাওয়ায় আমি সামাল দেওয়ার জন্য প্রথম সিনিয়রকে বলি: "বৌদি তোমার সাথে কি সব খাবার পাঠিয়েছে না? কোই বার করো দেখি!"

বিঃদ্রঃ প্রথম সিনিয়রটি এখন এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের পিতা এবং দ্বিতীয় সিনিয়রটি দ্বিতীয় বিবাহ করার পর থেকে খুব সুখী।