লেখক: পর্ব ১২
"যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায় সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তারা অসভ্যরকমে চুরি করে অথচ সভ্যতার যুগে পুরস্কার পাইবে তারাই?"
-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিক্ষার বাহন)
কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক বন্ধুর দেওয়ালে এই উক্তিটি দেখে আমি কমেন্ট করেছিলাম: "মাগ্গু মুর্দাবাদ!" মাগ (mug) অর্থাৎ মুখস্থ করাকে আমরা বরাবরই হেয় চোখে দেখি যদিও ছোটবেলাতে নামতা, কবিতা, ইত্যাদি মুখস্থ করানোয় আমাদের গুরুজনেরা, শিক্ষকেরা বিশেষ তৎপর ছিলেন। আমরা এতো কষ্ট করেও পড়া তৈরী করতে পারছি না আর তোরা শুধুমাত্র ভালো স্মৃতিশক্তি নিয়ে জন্মেছিস বলে এতো সহজে পার পেয়ে যাবি? মাগ্গুদের উপর জনসাধারণের রোষের কারণ হয়তো খানিক ঈর্ষাজনিত তবে এই কার্যকারণ বিশ্লেষণের মধ্যে না গিয়ে আমি বরং আমার নিজের জীবনে একবার মুখস্থ বিদ্যার দ্বারা কিভাবে পরীক্ষায় উৎরে গেছিলাম সেই বৃত্তান্ত ঝটপট বলে ফেলি।
সেই পরীক্ষাটা ছিল হিন্দী ভাষার। আমি আগেও একাধিকবার বলেছি যে বাবার বদলির চাকরি হওয়ার দরুণ -- CBSE, ICSE এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল -- এই তিনটি বোর্ডেই আমি পড়েছি। তখন আমি ক্লাস সিক্সে জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত হাসিমারা নামক এক জায়গায় এয়ারফোর্স স্কুলে ভর্তি হয়েছি। কৌতুকপ্রদ ব্যাপার হলো হাসিমারা জায়গাটি পশ্চিমবঙ্গের ভেতর হলেও সেখানে কোনো স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় না, ফলে আমাকেও সেখানে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দী নিতে হলো। হিন্দী ভাষায় অক্ষর জ্ঞান আমার আগে থেকেই ছিল কিন্তু ক্লাস সিক্সে ওইটুকু বিদ্যে দিয়ে কাজ চলবে কেন? আমার মনে আছে প্রথম প্রথম হিন্দী ভাষার ক্লাসে স্যারের দেওয়া ডিক্টেশন লেখার পর আমি নিজেই নিজের লেখার মাথামুন্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারতাম না। অতো চটজলদি হিন্দী লেখা কি দু-একদিনের কম্মো!
তার উপর হিন্দী ভাষার পরীক্ষায় আমাদের বংশের ট্র্যাক রেকর্ডও তেমন ভালো নয়। আমার দাদামশায়ের হিন্দী ভাষার উপর যথেষ্ট দখল না থাকায় প্রমোশন মিস করতে হয়েছিল। ঘটনাটা ভুলে গিয়ে থাকলে নিচের লিংকটা পড়ে আরেকবার ব্যাপারটা ঝালিয়ে নিতে পারেন।
http://kunalbanerjee.blogspot.in/2015/02/blog-post.html
বাবা নিজের জীবনে প্রথম হিন্দী পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি, শুধু "গরু" বিষয়ক একটি রচনা লিখে আসতে পেরেছিলেন। রচনাটি ছিল খানিকটা এরকম:
"গরু কা দো শিং হ্যায়। গরু কা চার প্যার হ্যায়। গরু কা এক ল্যাজ যায়। ..."
অর্থাৎ শব্দগুলির উচ্চারণ যদিও হিন্দীর মতোই কিন্তু আদতে শব্দগুলি লেখা বাংলা হরফেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেই পরীক্ষায় বাবার কপালে জুটেছিল একটি মস্ত বড় গোল্লা।
আমারও প্রথম প্রথম হিন্দী ভাষার ক্ষেত্রে জ্ঞান ছিল তথৈবচ। এয়ারফোর্স স্কুলে নিয়ম ছিল হাফ-ইয়ার্লি, অ্যানুয়াল এবং দুটি ইউনিট টেস্টের ভিত্তিতে বছরের শেষে ছাত্র ছাত্রীদের বিভিন্ন সাবজেক্টে পাশ ফেল, ক্লাসে র্যাঙ্ক, ইত্যাদি নির্ধারিত হবে। হাফ-ইয়ার্লি এবং দুটি ইউনিট টেস্টে হিন্দীতে আমার যা মার্কস এসেছিলো তাতে অ্যানুয়াল পরীক্ষাটা আমার কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছিল -- "করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে"! গোদের উপর বিষফোঁড়া অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় ইংরেজি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে শুনি সেদিন নাকি আসলে হিন্দী পরীক্ষা। আমি নিজের দোষেই দিনগুলো গুলিয়ে ফেলেছিলাম। যাই হোক, মোটের উপর পরীক্ষা ভালোই দিলাম। নির্ধারিত দিনে রেজাল্ট বেরলো -- আমি দেখি অ্যানুয়াল পরীক্ষায় হিন্দীতে হাইয়েস্ট মার্কস পেয়েছি, মাইরি বলছি! এতো দেখি সুকুমার রায়ের "নন্দলালের মন্দ কপাল" গল্পের নায়কের মতো অবস্থা যে কিনা সংস্কৃত পরীক্ষায় সর্বাধিক নম্বর পেয়েছিল। কাল্পনিক গল্প তাহলে বাস্তব জীবনেও ঘটে।
তবে আমার এতো ভালো ফল করার রহস্য কিন্তু সামান্যই। আমি হাফ-ইয়ার্লি আর ইউনিট টেস্টে লক্ষ্য করেছিলাম আমাদের হিন্দী ভাষার স্যার প্রত্যেক চ্যাপ্টারের শেষে যে প্রশ্নগুলো থাকে তার থেকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরী করেন। তাই অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে হিন্দী ভাষার সহায়িকা বইটা কিনে আমি আদ্যোপান্ত গাঁতিয়ে ফেলি।
পরিশেষে এটুকু বলে রাখি বাবা আবার কলকাতায় বদলি হয়ে ফিরে আসার পর কলকাতার স্কুলে যখন ভর্তি হই, তখন সেখানে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দী নিতে হয়। তার আগে আমি এতো ভালো হিন্দী শিখে গেছি যে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দীতে যা শেখানো হতো তা আমার কাছে ছেলেখেলা বলে মনে হতো। তাই কলকাতার স্কুলে হিন্দীতে আমি বরাবরই হাইয়েস্ট মার্কস পেয়ে এসেছি।