Monday, July 25, 2016

কয়েকজন বন্ধু মিলে চিলকা বেড়াতে গেছি। একটা ৬ জন চড়বার মতো নৌকা নিয়ে চিলকাতে ডলফিন দেখতে যাওয়া হয়েছে। ডলফিন এর তো আর দেখা মেলেই না । এক বন্ধু নৌকার এদিক থেকে ওদিক যাচ্ছে আর উঁকি মারছে জলে। নৌকাও দোদুল্যমান। নাবিক ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছিলো, কিন্তু কিছু বলছিলো না।  তারপর একটা শ্যাওলার মতো কিছু দেখে সেই বন্ধু ডলফিন বলে লাফিয়ে একদিকে যেতেই নৌকাটা একটু বেশিই দুলতে থাকে।  এবার আর মাঝি থাকতে না পেরে (ভাঙা ওড়িয়া আর ভাঙা বাংলায়) বলে উঠলো: "নৌকায় উঠে এতো এপট-উপট করলে আমার নৌকা লটপট করছে। এতো চটপট ছটপট করলে নৌকা তটে পৌঁছাবার আগেই এপটেই জলের মাঝে লোপাট হবে।"

সু্ত্র: পারমিশন ছাড়া নাম বলা বারণ।

Sunday, July 24, 2016

লেখক: পর্ব ১২

"যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায় সেই বা কম কী করিল? সভ্যতার নিয়ম অনুসারে মানুষের স্মরণশক্তির মহলটা ছাপাখানায় অধিকার করিয়াছে। অতএব যারা বই মুখস্থ করিয়া পাস করে তারা অসভ্যরকমে চুরি করে অথচ সভ্যতার যুগে পুরস্কার পাইবে তারাই?"
-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিক্ষার বাহন)

কিছুদিন আগে ফেসবুকে এক বন্ধুর দেওয়ালে এই উক্তিটি দেখে আমি কমেন্ট করেছিলাম: "মাগ্গু মুর্দাবাদ!" মাগ (mug) অর্থাৎ মুখস্থ করাকে আমরা বরাবরই হেয় চোখে দেখি যদিও ছোটবেলাতে নামতা, কবিতা, ইত্যাদি মুখস্থ করানোয় আমাদের গুরুজনেরা, শিক্ষকেরা বিশেষ তৎপর ছিলেন। আমরা এতো কষ্ট করেও পড়া তৈরী করতে পারছি না আর তোরা শুধুমাত্র ভালো স্মৃতিশক্তি নিয়ে জন্মেছিস বলে এতো সহজে পার পেয়ে যাবি? মাগ্গুদের উপর জনসাধারণের রোষের কারণ হয়তো খানিক ঈর্ষাজনিত তবে এই কার্যকারণ বিশ্লেষণের মধ্যে না গিয়ে আমি বরং আমার নিজের জীবনে একবার মুখস্থ বিদ্যার দ্বারা কিভাবে পরীক্ষায় উৎরে গেছিলাম সেই বৃত্তান্ত ঝটপট বলে ফেলি।

সেই পরীক্ষাটা ছিল হিন্দী ভাষার। আমি আগেও একাধিকবার বলেছি যে বাবার বদলির চাকরি হওয়ার দরুণ -- CBSE, ICSE এবং ওয়েস্ট বেঙ্গল -- এই তিনটি বোর্ডেই আমি পড়েছি। তখন আমি ক্লাস সিক্সে জলপাইগুড়ি জেলার অন্তর্গত হাসিমারা নামক এক জায়গায় এয়ারফোর্স স্কুলে ভর্তি হয়েছি। কৌতুকপ্রদ ব্যাপার হলো হাসিমারা জায়গাটি পশ্চিমবঙ্গের ভেতর হলেও সেখানে কোনো স্কুলে বাংলা পড়ানো হয় না, ফলে আমাকেও সেখানে সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দী নিতে হলো। হিন্দী ভাষায় অক্ষর জ্ঞান আমার আগে থেকেই ছিল কিন্তু ক্লাস সিক্সে ওইটুকু বিদ্যে দিয়ে কাজ চলবে কেন? আমার মনে আছে প্রথম প্রথম হিন্দী ভাষার ক্লাসে স্যারের দেওয়া ডিক্টেশন লেখার পর আমি নিজেই নিজের লেখার মাথামুন্ডু কিছু বুঝে উঠতে পারতাম না। অতো চটজলদি হিন্দী লেখা কি দু-একদিনের কম্মো!

তার উপর হিন্দী ভাষার পরীক্ষায় আমাদের বংশের ট্র্যাক রেকর্ডও তেমন ভালো নয়। আমার দাদামশায়ের হিন্দী ভাষার উপর যথেষ্ট দখল না থাকায় প্রমোশন মিস করতে হয়েছিল। ঘটনাটা ভুলে গিয়ে থাকলে নিচের লিংকটা পড়ে আরেকবার ব্যাপারটা ঝালিয়ে নিতে পারেন।
http://kunalbanerjee.blogspot.in/2015/02/blog-post.html
বাবা নিজের জীবনে প্রথম হিন্দী পরীক্ষায় কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি, শুধু "গরু" বিষয়ক একটি রচনা লিখে আসতে পেরেছিলেন। রচনাটি ছিল খানিকটা এরকম:
"গরু কা দো শিং হ্যায়। গরু কা চার প্যার হ্যায়। গরু কা এক ল্যাজ যায়। ..."
অর্থাৎ শব্দগুলির উচ্চারণ যদিও হিন্দীর মতোই কিন্তু আদতে শব্দগুলি লেখা বাংলা হরফেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সেই পরীক্ষায় বাবার কপালে জুটেছিল একটি মস্ত বড় গোল্লা।

আমারও প্রথম প্রথম হিন্দী ভাষার ক্ষেত্রে জ্ঞান ছিল তথৈবচ। এয়ারফোর্স স্কুলে নিয়ম ছিল হাফ-ইয়ার্লি, অ্যানুয়াল এবং দুটি ইউনিট টেস্টের ভিত্তিতে বছরের শেষে ছাত্র ছাত্রীদের বিভিন্ন সাবজেক্টে পাশ ফেল, ক্লাসে র‌্যাঙ্ক, ইত্যাদি নির্ধারিত হবে। হাফ-ইয়ার্লি এবং দুটি ইউনিট টেস্টে হিন্দীতে আমার যা মার্কস এসেছিলো তাতে অ্যানুয়াল পরীক্ষাটা আমার কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছিল -- "করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে"! গোদের উপর বিষফোঁড়া অ্যানুয়াল পরীক্ষার সময় ইংরেজি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে গিয়ে শুনি সেদিন নাকি আসলে হিন্দী পরীক্ষা। আমি নিজের দোষেই দিনগুলো গুলিয়ে ফেলেছিলাম। যাই হোক, মোটের উপর পরীক্ষা ভালোই দিলাম। নির্ধারিত দিনে রেজাল্ট বেরলো -- আমি দেখি অ্যানুয়াল পরীক্ষায় হিন্দীতে হাইয়েস্ট মার্কস পেয়েছি, মাইরি বলছি! এতো দেখি সুকুমার রায়ের "নন্দলালের মন্দ কপাল" গল্পের নায়কের মতো অবস্থা যে কিনা সংস্কৃত পরীক্ষায় সর্বাধিক নম্বর পেয়েছিল। কাল্পনিক গল্প তাহলে বাস্তব জীবনেও ঘটে।

তবে আমার এতো ভালো ফল করার রহস্য কিন্তু সামান্যই। আমি হাফ-ইয়ার্লি আর ইউনিট টেস্টে লক্ষ্য করেছিলাম আমাদের হিন্দী ভাষার স্যার প্রত্যেক চ্যাপ্টারের শেষে যে প্রশ্নগুলো থাকে তার থেকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্নপত্র তৈরী করেন। তাই অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে হিন্দী ভাষার সহায়িকা বইটা কিনে আমি আদ্যোপান্ত গাঁতিয়ে ফেলি।

পরিশেষে এটুকু বলে রাখি বাবা আবার কলকাতায় বদলি হয়ে ফিরে আসার পর কলকাতার স্কুলে যখন ভর্তি হই, তখন সেখানে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দী নিতে হয়। তার আগে আমি এতো ভালো হিন্দী শিখে গেছি যে থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবে হিন্দীতে যা শেখানো হতো তা আমার কাছে ছেলেখেলা বলে মনে হতো। তাই কলকাতার স্কুলে হিন্দীতে আমি বরাবরই হাইয়েস্ট মার্কস পেয়ে এসেছি।

Tuesday, July 19, 2016

লেখক: পর্ব ১১

সান্টা বারবারাতে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে কাউন্টারে গিয়ে অর্ডার দিয়েছি। কাউন্টারে কর্মরত মহিলাটি আমাকে খাবারের বিলের সঙ্গে একটি ছোট চৌকো ইলেক্ট্রনিক মেশিন হাতে ধরিয়ে দিলেন। মেশিনটার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সেটার গায়ে কিছু ক্ষুদ্র বাল্ব লাগানো আছে কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই জ্বলছে না। এই দেখে আমি তো প্রথমে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এটা নিয়ে আমি এখন কি করবো? কিছুক্ষণ কাউন্টারে দাঁড়িয়ে থেকে যে ব্যাপারটা লক্ষ্য করলাম সেটা হলো প্রত্যেক ব্যক্তি যে এসে কাউন্টার থেকে নিজের অর্ডার সংগ্রহ করছেন তাঁর হাতে ধরা মেশিনটার আলোগুলো জ্বলছে নিবছে, জ্বলছে নিবছে। এবার বিষয়টা আমার কাছে খোলসা হলো। এই মেশিন হাতে থাকলে কাস্টমারদেরকে আর কাউন্টারের সামনে ভিঁড় করতে হবে না, খানিক দূরে গিয়ে অপেক্ষা করলেও চলবে। হাতে ধরা মেশিনটাই সংকেত দিয়ে দেবে কখন তাদের খাবার প্রস্তুত হয়ে গেছে। (গুগল-এ সার্চ করে আমার দেখা মেশিনটার ছবি খুঁজে পেলাম না, তাই পাঠকদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদটা মেটাতে পারলাম না বলে দুঃখিত।)
যথা সময়ে আমার ডাক পড়ালো। আমি গিয়ে আমার অর্ডার কালেক্ট করলাম কিন্তু মুশকিল হলো রেস্টুরেন্টে কোথাও হাত মোছার ন্যাপকিন খুঁজে পেলাম না। আমি কাউন্টারে গিয়ে একজন কর্মচারীর কাছে ন্যাপকিন চাইলাম কিন্তু সে আমি কি চাইছি বুঝতেই পারলো না। আমি তখন ন্যাপকিনের সমার্থক ইংরেজিতে আর যে যে শব্দ জানি তা এক এক করে বলে গেলাম -- টিসু পেপার, পেপার টাওয়েল, হ্যান্ডকারচিপ, ইত্যাদি। কিন্তু সে দেখি কিছুতেই বুঝতে পারছে না আমি কি চাইছি। অবশেষে আমি ডাম্ব শারাড্স-এর জ্ঞান লাগিয়ে হাত মোছার অভিনয় করায় সে ব্যাপারটা ধরতে পারলো আর আমি শিখলাম ওখানকার লোকেরা নাকি আমার চাহিদার বস্তুটিকে বলে -- ওয়াইপি। ইংরেজিতে বানানটা লিখলে হয়তো পাঠকদের কাছে নামকরণটা স্পষ্ট হবে: wipe-y।

এবারের গল্পটা এখানেই শেষ নয়। আমি ব্যাঙ্গালোরে ফিরে এসে এই ঘটনাটা এক কলিগকে জানাই। তারপর আমরা একদিন এখানকার এক রেস্টুরেন্টে একসাথে খেতে যাই। ওয়েটার আমাদের কি লাগবে জিজ্ঞেস করায় আমার সেই কলিগ প্রথমেই বলে উঠলো: "Can we get some wipey?" এখানকার লোকজন ওয়াইপি শব্দটার সাথে মোটেও পরিচিত নয়, কিন্তু কুশলী ওয়েটার চটপট উত্তর দেয়: "সরি স্যার, আজকে আমাদের মেনুতে এই আইটেমটি নেই।"

পুনশ্চঃ বন্ধু প্রমিতের সহায়তায় যন্ত্রটার ছবি খুঁজে পেয়েছি। এই ধরণের যন্ত্রগুলিকে "রেস্টুরেন্ট পেজার" বলা হয়।
 সৌজন্যঃ ইন্টারনেট

Saturday, July 16, 2016

কি কারণে যেন ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর প্রসঙ্গ উঠেছে অফিসে চায়ের আসরে। এক কলিগ দাবি করে তার এক দূর সম্পর্কের পিসেমশাই নাকি RAW-এর কর্মী। সাধারণতঃ এই ধরণের সংস্থায় কর্তব্যরতরা নিজেদের দপ্তরের কথা গোপন রাখে, তাই আরেক কলিগ প্রথমজনের পিসেমশাই সত্যিই RAW-তে চাকরি করেন কিনা এই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। এতে প্রথমজন রেগে গিয়ে বলে যে তার পিসেমশাই সত্যি সত্যিই RAW-এর কর্মী -- তা না হলে পিসেমশাই মাঝে মাঝে দু-তিন মাসের জন্যে পুরোপুরি বেপাত্তা হয়ে যেতেন না। এই শুনে দ্বিতীয়জন মন্তব্য করে তাড়াতাড়ি খোঁজ নেওয়া উচিৎ পিসেমশাই আবার অন্য কোথাও আরেকটা সংসার পেতে বসেননি তো!

Tuesday, July 5, 2016

লেখক: পর্ব ১০

সম্প্রতি আমেরিকা থেকে ঘুরে এলাম। এখবরটা যারা ফেসবুকে আমার আপলোড করা ছবিগুলো দেখেছেন তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমার এই লেখাটা সফরকালীন কোনো বিষয় নিয়ে নয় বরং সফরে যাওয়ার প্রস্তুতি সংক্রান্ত বলা যেতে পারে।
দশ বছর আগে প্রথম পাসপোর্ট করিয়েছিলাম তাই এবছর সেটার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। কাজেই পাসপোর্ট রিনিউ করতে গেছিলাম ব্যাঙ্গালোরের এক পাসপোর্ট অফিসে। এই বিষয়ে সর্বশেষ প্রশাসনিক কাজটি ছিল পুলিশ ভেরিফিকেশন। আমার ডাক পড়ে নিকটবর্তী থানায় গিয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য। থানার কাজ মিটিয়ে হঠাৎ মনে হয় থানায় তো আর বারবার আসা হবে না তাই একবার এখানকার ফাটকটা দেখে যাই -- একটা নতুন অভিজ্ঞতা তো হবে। (এ ধরণের উটকো খেয়াল আমার মাথায় মাঝে মাঝেই আসে -- সে সব নিয়ে ভাবতে যাবেন না, আপাতত লেখাটা পড়তে থাকুন।) ফাটকের কাছে গিয়ে দেখি গারদের ভেতরে আমার বাড়ির মালিকের মতো দেখতে কে একজন বসে আছে। আমি চট করে ফাটকের ঝটিকা সফর শেষ করে বাড়ি ফিরে আসি। কাকে দেখতে কাকে দেখেছি এই ভেবে আমি আর মাথা ঘামাই না।
কয়েকদিন পর আমার বাড়ির মালিকের সঙ্গে বিল্ডিং-এর বাইরে দেখা। আমার পাসপোর্ট সংক্রান্ত সমস্ত কাজ মিটে গেছে কিনা তিনি জিজ্ঞাসা করলেন। আসলে ব্যাঙ্গালোরে আমার বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ বলতে একমাত্র সম্বল ছিল আমার বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্রটা, সেটা মালিকের কাছ থেকে চেয়ে এনেছিলাম বলে উনি খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। আমি ওঁনাকে উত্তরে জানাই যে বাকি সমস্ত কাজ তো আগেই হয়ে গেছিল, অন্তিম কাজটা ছিল পুলিশ ভেরিফিকেশন সেটাও সেরে ফেলেছি। আমার উত্তর শুনে বাড়িওয়ালা হেসে বললেন যে হ্যাঁ, উনি আমাকে পুলিশ স্টেশনে দেখেছিলেন।

এই ঘটনাটা আমি পূর্বে যাকেই বলেছি সে জিজ্ঞাসা করেছে যে আমি বাড়িওয়ালাকে জিজ্ঞেস করেছি কিনা যে উনি কেন গারদে ছিলেন। আমার নেতিবাচক উত্তর শুনে শ্রোতারা সবাই হতাশ হয়েছেন, আসলে আমার এই প্রশ্নটা না করার পেছনে একটা ভয় ছিল যে যদি উনি ফাটকে যাওয়ার কারণ হিসেবে বলতেন "ভাড়াটের সঙ্গে বচসা" তাহলে ব্যাপারটা আমার পক্ষে ভালো হতো কি!