Thursday, September 25, 2014

দিব্যেন্দু: পর্ব ৯

এই ঘটনাগুলির সঙ্গে যুক্ত মূল অভিযুক্তরা সকলেই এখন হাতের নাগালের বাইরে, তাই বিভিন্ন ব্যক্তির বারংবার বারণ সত্ত্বেও আজ এই কথাগুলো লেখার সাহস পেয়েছি।
আপনারা অনেকেই হয়তো ইতিমধ্যেই জানেন দিব্যেন্দুর "জল-বাতাস" দুই ধরণের বস্তুর উপরেই আসক্তি আছে। দ্বিতীয়টি তুলনামূলক ভাবে সস্তা, সহজলভ্য এবং কম প্রতিক্রিয়াশীল হওয়ার দরুণ সেটার সেবন নিয়মিত করলেও, দিব্যেন্দু প্রথমটির থেকে পারতপক্ষে দূরেই থাকে -- মুড না হলে বা অন্যের ট্রিট না হলে খায় না। তাই এই দ্বিতীয় বস্তুটিকে নিয়ে ঘটনাটাই প্রথমে বলি।

দিব্যেন্দু প্রতিদিন এক প্যাকেট করে এই বস্তুটি হোস্টেলের সামনে রবিদার দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসে এবং নিজের অবসরে অগ্নিসংযোগে তা একটি একটি করে ধ্বংশ করে। দিব্যেন্দুর এক জনৈক রুমমেট হঠাৎ কি খেয়ালে প্রতিদিন তার প্যাকেট থেকে একটি করে সেই বস্তু সরিয়ে নিতে থাকলো, সরিয়ে নেওয়ার পর প্যাকেটটা আবার সুন্দর করে মুড়ে রেখে দিতো যাতে দিব্যেন্দু বুঝতে না পারে। অল্প কিছুদিন পরপর সুখটানের থেকে কিঞ্চিত বঞ্চিত হওয়ার পর দিব্যেন্দু ঘটনাটা রবিদাকে বলে; প্যাকেটে মাল পুরোপুরি না থাকার কথা শুনে রবিদাও অবাক হয়। রবিদাকে অবাক হতে দেখে দিব্যেন্দু নিশ্চিত হয় গলদ নিশ্চয়ই গোড়াতে -- এবং তারপর দিব্যেন্দু কোম্পানি এভাবে কাস্টমারদেরকে ঠকিয়ে বছরে কতো টাকা লাভবান হচ্ছে তার হিসেব কষতে বসে।

একবার এক বন্ধু বিদেশ থেকে বিদেশি জল নিয়ে এসেছে। এ জিনিস তো আর রোজ রোজ ভাগ্যে জোটে না তাই দিব্যেন্দু বলে রেখেছিলো তার জন্যে যেন কিছুটা বাঁচিয়ে রাখা হয়। দিব্যেন্দু রুমে আসলে পর আরেক বন্ধু কাফ সিরাপের সঙ্গে খানিক স্প্রাইট আর খানিক (সত্যিকারের) জল মিশিয়ে তাকে খেতে দেয়, দিব্যেন্দু তাই খেয়ে খুশি হয়ে বলে: "বাহ, এর নেশাটা তো বেশ অন্য রকম!"

Saturday, September 20, 2014

"খোকা, তুমি বড় হয়ে কি হবে?" -- এ সব প্রশ্ন সেই ছোটবেলায় শুনেছিলাম, এতোদিন পর পিএইচডির শেষ লগ্নে এসে আবার এই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে হলো -- "পিএইচডির পর কি করবে ভাবছো: Post-doc, faculty না industry?"

বিদেশে গিয়ে Post-doc করার মতো বান্দা আমি নই -- ঘরের থেকে অতদূরে গিয়ে, নিজে রান্না-বান্না করে, অফিসে (থুড়ি, ল্যাবে) সারাদিন ঘাড় গুঁজে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। (এখানে খাওয়া-দাওয়া, লন্ড্রি, বাজার -- এসব কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, তাতেও বলে কাজ করতে পারি না আর ওখানে গেলে কিনা কাজ করে ফাটিয়ে দেব, এমনটা হয় নাকি?)

তাহলে হাতে রইলো ফ্যাকাল্টি আর ইন্ডাস্ট্রি। ফ্যাকাল্টি হতে গেলে কিছু গুণ থাকা আবশ্যক যেগুলো আমার মধ্যে বোধহয় নেই। যেমন ধরুন, মাথা ঠান্ডা রাখা -- আমার ধারণা আমার অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়; আর শিক্ষকের সহজে মাথা গরম হয়ে গেলে ছাত্ররা যে কতরকম ভাবে তার পেছনে লাগে সে অভিজ্ঞতা কম বেশী আমাদের সকলেরই আছে। তাছাড়া কোনো বিষয় পড়াতে গেলে সেটা ছাত্রদের মনোগ্রাহী করে পড়ানো উচিৎ যা অধিকাংশ শিক্ষকই পারে না। এই নিয়ে একটা ঘটনা বাবার কাছে শুনেছিলাম।

স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি পাওয়ার পর বাবাকে অনেক বিষয় ট্রেনিং-এর সময় পড়তে হয়েছিলো। তার মধ্যে একটি ছিল -- আইন। বাবাদের একজন আইনের টিচার ক্লাসে এসে প্রথমেই বললেন: "আইন খুব জটিল বিষয়, আমি যা যা বলছি সব খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে নোট করে রাখবে।" এই স্যারের ক্লাস ছিল ভীষণ একঘেয়ে।
কিছুদিন পর আরেকজন স্যার আইন পড়াতে আসেন, তিনি প্রথমেই বলেন: "আইন খুব ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট, আমি যা বলছি সব যুক্তির সঙ্গে ভাববে -- তাহলেই দেখবে বিষয়টা বেশ সহজ।" ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে তিনি একটি উদাহরণ দেন -- একবার ভারতে নতুন নিয়ম করা হয় যে কোনো দেবতার মন্দির দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দশ কাঠার বেশী রাখতে পারবে না, তার অধিক জমি থাকলে সরকার তা অধিগ্রহণ করবে। এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর রাধা-কৃষ্ণের একটি মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাদের দাবি যেহেতু মন্দিরে দুইজন দেব-দেবীর পুজো হয় তাই তাদের প্রাপ্য বিশ কাঠা জমি সরকারকে ছেড়ে দিতে হবে। সরকার পক্ষের উকিল যুক্তি দেখান যে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী (হিন্দু দেবতা যখন, তখন হিন্দু আইন-ই প্রযোজ্য) স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা আলাদা দাবিদার বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না, তাই রাধা-কৃষ্ণের মন্দিরের দশ কাঠা জমিই প্রাপ্য। এই শুনে বাদী পক্ষের উকিল কোর্টে পণ্ডিতকে ডেকে শাস্ত্র খুলে দেখিয়ে দেন শাস্ত্রে কোথাও রাধা কৃষ্ণের বিয়ের কথা লেখা নেই, অর্থাৎ সরকার পক্ষের উকিলের যুক্তি ধোপে টিকবে না। শেষ পর্যন্ত, এই মামলায় মন্দির কর্তৃপক্ষই জয়ী হন।
সেই স্যার আরেকটি মজার মামলার কথা বলেছিলেন। হিন্দু, মুসলমান আর শিখ -- তিনটি সম্প্রদায়ই কোর্টে মামলা করেছে হনুমান কোন ধর্মাবলম্বী এই বিবাদের সমাধান করতে; সকলেরই দাবি হনুমান তাদের ধর্মের একজন। হিন্দুর যুক্তি: হনুমানের কথা কোন বইয়ে লেখা আছে -- রামায়ণ, এটি যেহেতু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ তার মানে হনুমানও হিন্দু। মুসলমানের যুক্তি: মুসলিম নাম কি ধরণের হয় -- উলেমান, সুলেমান, ঠিক সেরকমই ছন্দ মিলিয়ে হনুমান, নাম থেকেই মালুম হচ্ছে হনুমান মুসলমান। শিখের যুক্তি: নাম দিয়ে কারো বিচার করা উচিৎ, বিচার করা উচিৎ তার কাম দিয়ে; লঙ্কায় যখন হনুমানের ল্যাজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো তখন পাশে এতো বড়ো সমুদ্র থাকতেও হনুমান নিজের ল্যাজের আগুন কিভাবে নেভালো -- না, নিজের মুখের মধ্যে ল্যাজ ঢুকিয়ে দিয়ে, এমন কাজ একমাত্র পাঞ্জাবিদের পক্ষেই সম্ভব। এই মামলার শেষ পর্যন্ত কি নিষ্পত্তি হয়েছিল তা অবশ্য আমার জানা নেই।    

যাই হোক, আমি ভাবছি ইন্ডাস্ট্রি জয়েন করবো -- এখনো দেরি আছে অবশ্য, আরেকটু ভেবে দেখি।

Saturday, September 6, 2014

আমার গল্পের কালেকশন লিখে রাখতাম যে ডায়েরিটায়, সেটা গতকাল ফুরিয়ে গেছে। ডায়েরি ফুরিয়ে যাক তাতে কোনো অসুবিধে নেই, নতুন একটা দোকান থেকে কিনে নিলেই হলো; কিন্তু গল্প ফুরিয়ে গেলেই মুশকিল। গল্পের ভাঁড়ার চিরকালই অপ্রতুল তবে মাঝে মাঝে অপ্রত্যাশিত ভাবেই এক-আধটা গল্প কানে চলে আসে। এই সেদিন, গণেশদার ক্যান্টিনে একা চুপচাপ বসে ব্রেকফাস্ট করতে করতে আমার পাশে বসা দুটি অপরিচিত ছেলের কথোপকথন শুনে খুব মজা পেলাম।

একজন ছেলে আরেকজনকে তার ট্রেনে লব্ধ একটি অভিজ্ঞতার কথা বলছে।
একবার ট্রেনে করে যাওয়ার সময় সিগারেট খাওয়ার জন্যে টিটিই তাকে হাজার টাকা জরিমানা করে।
ছেলেটি তাতে আপত্তি জানিয়ে বলে: "ধূমপানের জন্য তো দুশো টাকা ফাইন লেখা আছে ?"
টিটিই: "ঠিক ধরেছেন। সিগারেট খাওয়ার জন্য দুশো টাকাই ফাইন করেছি, আর দেশলাই-টার জন্য আটশো টাকা।"
ছেলেটি: "মানে ?"
টিটিই: "আরে ! এটা জানেন না, flammable object নিয়ে ট্রেনে ওঠার ফাইন আটশো টাকা।"
ছেলেটি তবুও কিন্তু কিন্তু করছে দেখে টিটিই যোগ করেন: "এটা আশাকরি নিশ্চয়ই জানেন -- অনাদায়ে জেল হতে পারে !"

Tuesday, September 2, 2014

ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার (আবার নিশান কর্তৃক)
----------------------------


সে আমলে সিউড়ি থেকে কলকাতার একটিই ট্রেন ছিলো, ময়ূরাক্ষী ফাস্ট প্যাসেঞ্জার। সিঙ্গল লাইন, ট্রেন চলতো মন্থর বেগে অণ্ডাল অব্দি, তারপর সাঁ সাঁ করে দৌড়তো। দুর্গাপুর থেকে গুচ্ছের লোক উঠতো কারণ নামমাহাত্ম্যের দরূন লোকালের ভাড়ায় এক্সপ্রেস যাওয়া যেত।

প্রসঙ্গতঃ দুর্গাপুরের যে দলটি উঠতো তাদের মধ্যে অধিকাংশই ছোটলোক, এবং এরকম ভয়াবহ প্যাসেঞ্জার গোটা পশ্চিমবাংলায় আর কোথাও পাওয়া যাবে নাকি আমার সে বিষয়ে সবিশেষ সন্দেহ আছে। এঁরা সকালবেলা ডাউনট্রেনে উঠেই দাবী করতেন তিনজনের সিটে চারজন বসতে দিতে হবে, কারণ "এটাই নিয়ম" এবং "এভাবেই চলে আসছে" এবং উপপাদ্য ট্রেনের বেশ কটি কামরা ও সিট তাঁদের পিতৃদত্ত সম্পত্তি। অতএব আপ ট্রেনে বিকেলবেলা যখন আপনি উঠছেন, ততক্ষণে তারা পিতৃদত্ত সম্পত্তিতে অধিকার স্থাপন করে ফেলেছেন, আর আপনি যদি বলতে গেলেন "এ ট্রেনে তো তিনজনের সিটে...." ব্যস আপনার ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ স্বর্গে বসে ঢোক এবং হেঁচকি তুলতে আরম্ভ করবেন।

এরকমই এক বিকেলে নরেন্দ্রপুর থেকে ফেরার সময়, আমি বাবা ও আমার পাড়ার দাদা, দীপকদা, লটবহর সহ হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। দীপকদা তৎপর ছেলে, ট্রেন ঢোকার সময় চলমান অবস্থাতেই টুক করে একটা কামরায় ঢুকে পড়লো, এবং গোটা তিনেক সিট রুমাল ও সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে নিশ্চিৎ করে আমাদের ডাকতে নিচে নেমে এলো। আমি দুখানা ব্যাগ নিয়ে ভিড় ঠেলে কোনমতে উঠলাম, বাইরে থেকে হাজার চিৎকারের মাঝে দীপকদার নির্দেশ মত সিটে পৌঁছে দেখি এক স্থুলকায় ভদ্রলোক আমার জায়গায় দিব্যি বসে আছেন।

আমি বললাম, ভদ্রভাবেই, "কাকু, এই জায়গাটা কিন্তু আমার।"
"আপনার মানে?"
"মানে আমার দাদা জায়গাটা আমার জন্য রেখেছে"
"ইয়ার্কি হচ্ছে, অন্য একজন জায়গাটা রেখেছে, আপনার মানে, ডেঁপো ছেলে, ইয়ার্কি হচ্ছে?"

গরমে ঘামে এবং লোকের বগলের গন্ধে আমার ত্রাহি মাম অবস্থা, দাঁড়াতে পারছি না, এদিকে কাঁধে দু পিস ব্যাগ। এই কথোপকথন চলাকালীন দীপকদাও উঠে এসেছে। আমাকে বললো "একি নিশান, বসোনি কেন? জায়গা রেখেছি তো!"
আমি কাকুর দিকে তাকালাম, মাথায় আগুন জ্বলছে, বললাম "দেখলেন তো বলেছিলাম আমার জায়গা, শুনলেন না, এবার হোলো তো? উঠে পড়ুন তো মশাই!" 
মশাই আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে খানিক সরে বসলেন, আমি দীপকদাকে বললাম "তুমি ওখানে বসো" বলে আমি উল্টোদিকের সিটের তলায় নানা কসরত করে ব্যাগ ঢোকাতে শুরু করলাম, বাজি রেখে বলতে পারি আর দিন সাতেক করলে আমি অলিম্পিকে কোন না কো বিভাগে নিশ্চিৎ সোনা বাগিয়ে আনতাম, অতি দুরূহ ও জটিল কাজ। যাই হোক মিনিট দুয়েক পরে কাকু হঠাৎ জ্বলে ঊঠে বললেন " উঠে পড়ুন মশাই কি ধরনের কথা হে ছোকরা, সহবৎ শেখোনি?"

আমি তখনো ব্যাগ নিযে ঝামেলায়, মাথা তড়াক করে জ্বলে যাওয়ায়, আমি বললাম "বেশী বকবেন নাতো মশাই চুপ করুন দেখি!"
কাকু আবার দমে গেলেন, ব্যাগ ঢোকাতে আরো মিনিট চারেক লাগলো, আমি উঠে বসে রুমালে মুখ মুছছি, উটকো গরম, হঠাৎ কাকু আবার জ্বলে ঊঠলেন, ওনার এই দোদমা বোমা গোছের খেপে খেপে জ্বলে ওঠাটা আমি ঠিক বুঝে উঠিনি আজও।
এবার বললেন "চুপ করুন তো মানে কি? তুমি ঠিক করে দেবে আমি চুপ করবো না করবো?"

ততক্ষণে আমার তুরীয় অবস্থা চলে এসেছে, আমি রুমাল নামিয়ে নির্বিকার স্বরে বললুম "ও চুপ করবেন না? তা বেশ তো! চেঁচান!"
কাকু তেড়েমেরে কিছু একটা বলার জন্য হাঁ করেছিলেন, কিন্তু আমার কথার সত্যতা প্রমাণের শঙ্কাতেই বোধহয়, দেখলাম কোঁৎ করে আধবেরোন কথা আবার গিলে ফেললেন।

Monday, September 1, 2014

২১৮ (নিশান কর্তৃক)
------

কুণাল এত লিখছে দেখে আমার আরেকখানা ঘটনা মনে পড়ে গেলো, আমি কুণাল ও জ্যোতি গেছি ধর্মতলায় সিনেমা দেখতে, কি সিনেমা মনে নেই, দেখার পর হাঁটতে হাঁটতে, পার্ক সার্কাসের কাছাকাছি এসে ২১৮ বাস ধরা হোলো। ভুক্তভোগী মাত্রেই জানেন ২১৮ কি জিনিস, গরমকালে এখানে লোহা সেদ্ধ করা যায়, শীতকালে নিদেন পক্ষে আলু বা বেগুন। টিকিট কাটার দরকার কোনদিন বোধ করিনি। সামনের দরজা দিয়ে উঠে পেছোতে পেছোতে পেছনের দরজা দিয়ে নেমে যেতাম। আর সামনের কণ্ডাকটর জিজ্ঞেস করলে বলতাম পেছনে টিকিট হয়ে গেছে, পেছনের জন জিজ্ঞেস করলে সামনে, ভিড় এত প্রবল হোতো যে সেটা অপ্রমাণ করা রীতিমত দুঃসাধ্য ছিলো।

যাইহোক সেদিন কোন এক অজানা কারণে বাসে তখনো ভিড় তেমন নেই, এবং প্রাথমিক ভুল হিসেবে আমরা বসে পড়লাম লেডিস সিটে, স্বভাবতঃই মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সে সিট থেকে উৎখাত হলাম, কিন্তু ভিড় এমন বেশী যে নড়াচড়ার জায়গা নেই। অতএব লেডিস সিটের সামনেই দাঁড়িয়ে বাইরের নরক গুলজার জানলার আধখানা দিয়ে উপভোগ করছিলাম।

যাইহোক প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এক শ্রেণীর ছেলে থাকে যাদের স্বভাব মেয়ে দেখলেই লালা ঝরা, এবং সুযোগ পেলেই বাসে ট্রেনে মেয়েদের গিয়ে হাত দেওয়া, আর এক শ্রেণীর মহিলা থাকেন যাঁদের ধারণা সমস্ত ছেলের সমস্ত চেতনা কেন্দ্রীভূত তাঁকে এবং তাঁকেই ঘিরে। প্রকৃতির কোন এক অমোঘ চক্রান্তে এই দুই শ্রেণীর কখনোই মোলাকাত হয়না! যাই হোক, আমি তো দিব্যি দেখছি বাইরে। হঠাৎ শুনি কেউ একজন বললেন "এই যে শুনছেন?"
আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি কে বুঝলাম না।
এইবার হাঁটুতে খোঁচা "হ্যাঁ হ্যাঁ আপনাকেই বলছি!"
সামনের সিটের মহিলা আমার দিকে রোষকষায়িত নয়নে চেয়ে, ভয়ানক আতঙ্কের সাথে লক্ষ্য করলাম আমি কুণাল ও জ্যোতি কাউকেই দেখতে পাচ্ছি না!
ঢোক গিলে বললাম "আ..আমাকে বলছেন?"
"হ্যাঁ, হ্যাঁ আপনি! আপনি তখন থেকে আমার গায়ে নিশ্বাস ফেলছেন কেন?"
আমার তো ভয়ে হয়ে গেছে, ২১৮ তে মহিলা মহলের সভাপতি পুরুষের সংখ্যা প্রচুর, আর গণধোলাই কাকে বলে আমি ভালোই দেখেছি!
আশেপাশে গুণগুণ শুনছি...
আমি আরো বার চারেক ঢোক গিলে বললাম "মানে, আমি তো আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি, আর কোথায় নিশ্বাস ফেলবো বুঝতে পারছি না..."
আর দেখে কে! আরো আগুন, তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে বললেন, "কই আর কেউ তো ফেলছে না!"
হঠাৎ করে ভয় কেটে গিয়ে আমার মাথাও গেলো জ্বলে!
আমি বললুম "দেখুন যে যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার গায়েই নিশ্বাস ফেলছে, আপনার দরকার থাকে বলুন আমি বাকিদেরও বলছি আপনার গায়ে নিশ্বাস ফেলতে!"
আর দেখে কে, মহিলা এমন রেগে গেলেন যে ৩০ সেকেণ্ড কোন বাক্যস্ফুর্তি হোলো না, বাস তখন গড়িয়াহাটের ব্রিজে উঠছে, আমি এই সুযোগ বুঝে বললুম, "দিদি সরুন সরুন সরুন একটু!"
থতমত খেয়ে তিনি মাথা ৩০º ঘুরিয়ে ফেললেন জানলা থেকে, বললেন "ক...কেন?"
আমি বললাম " নানা মানে জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে টুক করে নিঃশ্বাসটা বাইরে ফেলে দেবো।"
বলেই একগাল হাসি!

আর দেখে কে, আশেপাশের কয়েকজনও ফিক ফিক করে হাসছে, তিনি আমাকে চপেটাঘাত করার আগেই আমি ভয়ানক জোরে আরো ভিড়ের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম, ২১৮য় আমায় ধরে কোন শালা?