Monday, November 30, 2015

-- ধর, তুই একদিনের জন্য যে কোনো মানুষ হতে পারবি। তাহলে তুই কে হতে চাইবি?
-- দাঁড়া, একটু ভেবে দেখি।
-- উফ,আর কতো ভাববি? বল এবার তুই কে হবি?
-- আমি একজন গরিব দুঃখী মানুষ হব।
-- অ্যা, এ আবার কেমন ইচ্ছে? আমাকে কেও এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলে আমি বলতাম যে আমি একদিনের জন্য কোনো বড় অভিনেতা হতে চাই।
-- কেন?
-- কেন আবার ! বড় বড় অভিনেতাদের কতো টাকা থাকে। একদিনের জন্য যেখানে খুশি বেড়াতে যেতাম, যা খুশি কিনতাম, দামী গাড়ি চড়তাম। আশেপাশে ফ্যানরা অটোগ্রাফের জন্য ঘোরাঘুরি করতো। ভাবতেই কেমন শিহরণ হচ্ছে।
-- আর ওই দিনটা শেষ হয়ে গেলে তারপর কি করতিস?
-- আবার সেই পুরনো রুটিন তবে বারবার ওই একটা দিনের কথা ভাবতাম।
-- তার মানে বারবার ওই দিনটার কথা হাপিত্যেশ করতিস। জীবনের বাকি দিনগুলো ওই দিনটার তুলনায় ম্যাড়মেড়ে বলে মনে হবে বলে বেসিক্যালি জীবনের আর কোনদিনটাই উপভোগ করতে পারবি না।
-- হুমম, এভাবে তো ভেবে দেখিনি।
-- তার জায়গায় একদিন গরিব দুঃখী মানুষ হয়ে কাটালে ওই একটা দিনের কষ্ট তোকে জীবনের বাকি দিনগুলোকে প্রাণ খুলে এনজয় করতে সাহায্য করতো।

Sunday, November 29, 2015

লেখক: পর্ব ৮

আগেই লিখেছি বাবার বদলির চাকরি হওয়ার দরুণ ছেলেবেলায় ICSE, CBSE এবং West Bengal এই তিনটে বোর্ডেই পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। বরাবর ইংলিশ আমার ফার্স্ট ল্যাঙগোয়েজ ছিল আর বাংলা সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ। মাঝখানে শুধু হাসিমারায় এয়ার ফোর্স স্কুলে পড়ার সময় হিন্দি আমার সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ ছিল কারণ সেই স্কুলে বাংলা পড়ানো হতো না। তবুও আমি বাংলায় গল্প লিখতে যতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি ইংলিশে ততটা নয়। সম্প্রতি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের "ইতি পলাশ" বইটা পড়ে জানলাম কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে গেলে সেই ভাষায় শুধু লিখলে পড়লে হবে না, সেই ভাষায় স্বপ্ন দেখাটাও অভ্যেস করতে হবে। চিরকাল বাংলায় স্বপ্ন দেখে আসার ফলেই হয়তো ইংরেজি ভাষার সঙ্গে সেভাবে আত্মীয়তা গড়ে উঠলো না। তবে ইংরেজি ভাষায় গল্প লিখতে না পারা নিয়ে আমার ক্ষোভ নেই বিশেষ করে এই গল্পটার ক্ষেত্রে কেননা আমার ধারণা একমাত্র বাঙালিরাই এই গল্পের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম।

নতুন অফিসে ঢুকে আমি ঠিক করেছিলাম যে সেখানকার ক্যান্টিনের সমস্ত খাবার আমি চেখে দেখব। এই ভেবে শুরুতে আমি প্রত্যেকদিন আলাদা আলাদা ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ নিতাম। আমার এই অভ্যাসের কথা শুনে একদিন এক সহকর্মী সেদিন লাঞ্চে আমাকে কর্ণাটকের বিশেষ খাবার "রাগি মুদ্দে" চেখে দেখার পরামর্শ দিল। রাগি মুদ্দে খাদ্যটি কালো রঙের, গড়নটি গোলগাল অনেকটা ক্রিকেট বলের মতো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় আপেলের মতো কামড়ে খেতে হয়। আমাকে সেই সহকর্মী জানায় কন্নড়রা রুটির বদলে রাগি মুদ্দে খায় সম্বরে ভিজিয়ে। একটুখানি রাগি মুদ্দে ছিঁড়ে সম্বর ডালে ডুবিয়ে মুখে দিয়েছি। দেখি খাবারটা কেমন চ্যাটচ্যাটে যেন কাদা খাচ্ছি। চিবিয়ে চলেছি তো চলেছিই। স্বাদটাও বিস্বাদ। খানিক বাদে সেই সহকর্মী আবার জানায় যে রাগি মুদ্দে মুখে দিয়ে গিলে নেওয়াটাই নাকি দস্তুর, খাবারটাকে চিবোতে নেই। উপদেশ কার্যে পরিণত করতে গিয়ে দেখি বেশ ভয় করছে, রাগি মুদ্দে গিলতে গেলে মনে হচ্ছে খাদ্যনালীটা এই বুঝি আটকে যাবে। অতএব সেদিন লাঞ্চে কার্যত উপোস করেই থাকতে হবে বুঝতে পারলাম।
এক্ষণে আমাদের অফিসের ক্যান্টিনের একটা বৈশিষ্ট বলে রাখি। এখানে প্রত্যেকদিন আগেরদিন কর্মীরা কতোখানি খাবার নষ্ট করেছে আর তা দিয়ে কতোজন মানুষের উদরপূর্তি করা সম্ভব তার একটা হিসেব লেখা থাকে। যেমন ধরুন: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ১০০জন মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" এই লেখার উদ্দেশ্য যাতে লোকে খাবার নষ্ট না করে। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাধু পরিকল্পনা।
কিন্তু সেদিন রাগি মুদ্দের জন্য আমাকে উপবাস করে থাকতে হবে বলে আমার মনমেজাজ বিগড়ে গেছে। আমি সেই সহকর্মীকে জানাই যে পরেরদিন অফিসের ক্যান্টিনে এরকম একটা লেখা লিখে রাখা উচিৎ: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ৯০জন মানুষের আর ১০জন কন্নড়ের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" কারণ সেদিনের নষ্ট হওয়া সমস্ত রাগি মুদ্দে যে কোনো মানুষের খিদে মেটাতে পারবে না, রাগি মুদ্দের সদ্ব্যবহার কন্নড়দের দ্বারাই সম্ভব, বাঙালিদের দ্বারা তো কোনো মতেই নয়।

পরিশেষে: আমার এই "রেসিস্ট" মন্তব্যের শাস্তিস্বরূপ সেদিন বিকেলে চায়ের সময় আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকের জন্য বিস্কুটের যোগান আমাকে দিতে হয়েছিল। আমি নিজেই একটা পুরো প্যাকেট সাবড়ে দিয়েছিলাম, দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি কিনা।

Monday, November 23, 2015

"মাতাল" হচ্ছে সে যে মদ খায়।
আর "পেঁচো মাতাল" হচ্ছে সে যে একা একা মদ খায়।
এই পেঁচো মাতালের তকমাটা সচরাচর কেও পেতে চায় না, কারণ সংজ্ঞা অনুযায়ী পেঁচো মাতাল সাধারণ মাতালের চেয়েও এক কাঠি বাড়া।
দুই বন্ধু এখন দুই দেশে থাকে, টাইম জোনও আলাদা। কিন্তু সময় করে তারা সপ্তাহান্তে কম্পিউটারের সামনে বসে স্কাইপ খুলে একে অপরের সামনে বসে মদ খায়।
টেকনোলজির সহায়তায় টেকনিকালি তারা কেও "পেঁচো মাতাল" নয়।

Sunday, November 8, 2015

আমার দাদুকে নিয়ে কিছু ঘটনা আগে লিখেছি। যেমন ধরুন সেই ইন্টারভিউ নিয়ে ঘটনাটা। মনে না পড়লে নিচের লিংকটা দেখতে পারেন।
http://kunalbanerjee.blogspot.in/2015/02/blog-post.html

তবে সে সব ঘটনাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরের ইতিহাস। এবার দাদুকে নিয়ে প্রাক-স্বাধীনতা যুগের একটা ঘটনা বলি।

তখন দাদু কলেজে পড়ে। এমন সময় গান্ধীজী "ভারত ছাড়ো" আন্দোলনের ডাক দিলেন। গোটা দেশে স্বাধীনতার জোয়ার। সমস্ত যোয়ান ছেলের রক্ত টগবগ করে ফুটছে। তখন দাদু আর তার এক বন্ধু ঠিক করলেন তাঁরাও নিজেদের সাধ্য মতো স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেবেন। সে সময় মাঝে মাঝেই আন্দোলনকারীরা সরকারী অফিসের সামনে অবরোধ করতেন। দাদু আর তাঁর বন্ধু সেই অবরোধে যোগদান করবেন মনস্থির করে সরকারী অফিসের সামনে গিয়ে উপস্থিত হন। গিয়ে দেখেন ঘোড়ায় চেপে এক গোরা সাহেব আন্দোলনকারীদের বেধড়ক মারছেন। আন্দোলনকারীরা সবাই গান্ধীজীর অনুগামী তাই তারা সবাই মুখ বুজে সেই মার সহ্য করছেন। কিন্তু এই দেখে তো আমার দাদুর আর তাঁর বন্ধুর শুকিয়ে গেল। (গলা শুকিয়ে গেল।) তাঁরা চুপচাপ সেখান থেকে কেটে পড়লেন।
পরদিন দুই বন্ধু কলেজে ঢুকে দেখেন সামনেই এক গোরা প্রফেসরের বাচ্ছা ছেলে নিজের মনে খেলা করছে। সে সময় কলেজের বেশির ভাগ অধ্যাপকই সাহেব ছিলেন। তাদের কোয়ার্টার কলেজের লাগোয়া ছিল বলে তাঁদের ছেলেমেয়েরা কলেজের আশপাশেই খেলাধুলো করতো। সেই বাচ্ছাটিকে দেখে দাদুর বন্ধু আদর করে তাকে কাছে ডাকলেন। বাচ্ছা ছেলেটি সরল মনে বন্ধুর কাছে গেল, বোধহয় লজেন্স-টজেন্স পাওয়ার আশায়। দাদুর বন্ধুটি তখন আদর করার ছলে খুব জোরে সেই বাচ্ছাটির গাল টিপে দিলেন। বাচ্ছাটি ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠতেই দাদুর বন্ধু "বন্দে মাতরম" চেঁচিয়ে উঠে সেখান থেকে ছুটে পালালেন।
কথায় আছে "বাঘে ছুলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুলে ছত্রিস।" সে সময় বোধ করি পুলিশে ছুলে চুয়ান্ন কি বাহাত্তর ঘা পড়তো। তাই প্রথমে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেও আমার দাদু কাল বিলম্ব না করে বন্ধুর পিছু পিছু চোঁ চাঁ দৌড় লাগালেন।

Monday, November 2, 2015

লেখক: পর্ব ৭

হাতে গরম পাতে গরম ঘটনা। অর্থাৎ ঘটনাটা আজকেই ঘটেছে। বাবা মা বেঙ্গালুরু আসবে বলে ইন্ডেন গ্যাসের অফিসে গেছি। গিয়ে দেখি দোকানের কিছু কর্মচারী আসে পাশে ঘোরাঘুরি করলেও অফিস বন্ধ। কর্মচারীদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম অফিস কখন খুলবে। সে জানালো বড়বাবুর আসার সময় হয়ে গেছে, এক্ষুনি চলে আসবেন আর উনি আসলেই অফিস খোলা হবে। ঘড়িতে দেখি তখন এগারোটা কুড়ি বাজছে, অফিস খোলার সময় দেওয়ালে লেখা আছে এগারোটা। কি আর করি, অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অ্যাদ্দূর যখন এসেছি তখন গ্যাস কানেকশনটা খড়্গপুর থেকে বেঙ্গালুরুতে ট্রান্সফার করে তবেই যাব।

খড়্গপুরে গ্যাস কানেকশন নেওয়ার পেছনে কিছু কারণ আছে। আইআইটি খড়্গপুরে ঢুকে প্রথমে আমার বাস ছিল VSRC নামক এক হোস্টেলে। এই হোস্টেলটি কর্মকর্তারা বানিয়েছিলেন বিবাহিত স্টুডেন্টদের জন্যে। পরে ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই হোস্টেলটি ব্যাচেলর স্টুডেন্টদের বাসভূমি হয়ে ওঠে। আইআইটির অন্যান্য হোস্টেলগুলির মতো এই হোস্টেলটির সর্বজনীন ক্যান্টিনের পরিকাঠামো না থাকায় এই হোস্টেলের কিছু কিছু ছাত্রেরা দল বানিয়ে আলাদা আলাদা মেস করে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আমি ঢুকেছিলাম অমিতদার মেসে। এই মেসে থাকাকালীন জনগণের সুবিধার্থে গ্যাস কানেকশান নিয়েছিলাম নানা লোকের প্ররোচনায়। পরে আইআইটিতে অন্য হোস্টেলে বদলি হয়ে যাবার পরও আড়াই বছর ধরে আমার নামের গ্যাস কানেকশনেই অমিতদার মেসে রান্না হত। সেই নিয়ে অবশ্য আমার কোনো দুঃখ নেই, পুরনো মেসে কোনো উপলক্ষে ভালো খাওয়াদাওয়া থাকলেই আমার নেমন্তন্ন একরকম পাকা ছিল। আর আইআইটিতে পড়াকালীন উপলক্ষের অভাবও তেমন ছিল না। কনফারেন্স বা জার্নালে পেপার অ্যাকসেপ্ট হলে সেলিব্রেশন তো আছেই সাথে আরো কতোরকমের হুজুগ। একবার মনে আছে মেসের এক ছাত্র খুব নামকরা এক কনফারেন্সে পেপার পাঠিয়েছে, পেপার অ্যাকসেপ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমন সময় সেই ছাত্রকে সবাই মালে ধরা হলো বাকিদের খাওয়ানোর জন্য -- কারণ? ওই ছাত্রের মতো ওরকম কঠিন কনফারেন্সে পেপার পাঠানোর সাহস আর ক'জনই বা দেখিয়েছে? ছাত্রটির বুকের পাটা আছে একথা তো সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবে। ছাত্র তো যে সে সাধারণ ছেলে নয়, পুরো বাঘ বাচ্চা ! এরকম কতো কিছু বলে বাড় খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রিট আদায় করেছিলাম।

যাই হোক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। আশায় আশায় দাঁড়িয়ে আছি, বড়বাবু বুঝি এই এলেন। অবশেষে সাড়ে বারোটার সময় বড়বাবু এলেন। অফিস খোলা হলো। আমি কেন এসেছি জিজ্ঞেস করায় ওনাকে জানালাম আমার গ্যাস কানেকশন ট্রান্সফারের ব্যাপারটা।
-- আগের ডিলারের কাছ থেকে ট্রান্সফারের কাগজ নিয়ে এসেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- অ্যাড্রেস প্রুফ এনেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- আইডি প্রুফ এনেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি?
-- হ্যাঁ, স্যার। এই যে।
বড়বাবু কিছুক্ষণ আমার কাগজপত্র মন দিয়ে দেখলেন। কাগজে কোনো খুঁত খুঁজে না পেয়ে বললেন
-- আপনি তো দেখছি সমস্ত প্রিপারেশন নিয়েই এসেছেন।
এই শুনে তো আমি খুব খুশি। আন্দাজ করে সমস্ত কাগজ একবারে ঠিকঠাক নিয়ে এসেছি। পারলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিই। এক ঘন্টার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে -- সে সব যাকগে, সরকারী অফিসে এসে কোনো অসুবিধে ছাড়াই নির্বিঘ্নে কাজ হয়ে গেছে -- একথা কে কবে শুনেছে?
এরপর বড়বাবু আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন:
-- এই নিন, এই কাগজে আমাদের মেন অফিসের ঠিকানা লেখা আছে। সেখানে গিয়ে আপনার কাগজপত্র দেখান, আপনার গ্যাস কানেকশন ট্রান্সফার হয়ে যাবে। হয়ে গেলে এখানে গ্যাসের বইটা নিয়ে চলে আসবেন, আমরা গ্যাস সিলিন্ডার আপনার ঘরে পাঠিয়ে দেব। এই অফিসটা তো শুধুমাত্র আউটলেটের জন্য, গ্যাস ট্রান্সফার ইত্যাদি সব আমাদের মেন অফিসেই হয়।
-- যাচ্চলে !!!