"টুকলি
রহস্য"
ব্যাটা
পরীক্ষায় টুকলি করছে এ ব্যাপারটা তো
নিশ্চিত -- কিন্তু করছে কি ভাবে? নিজের টাক চুলকোতে চুলকোতে ভাবতে থাকেন ভূদেববাবু। খুব
মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবতে গেলেই ভূদেববাবু নিজের মাথা চুলকোতে থাকেন -- এটাকে ওনার একটা "মুদ্রাদোষ" বলা যেতে পারে।
টিচার্স
রুমে ঢুকে শ্যামলবাবু ভূদেববাবুকে দেখে বলে উঠলেন: "কি ভূদেববাবু, এতো কি ভাবছেন? মাথায় বাকি যে কটা চুল আছে তাও তো এবার থাকবে না।" ভূদেববাবু
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে নিজের ক্রমহ্রাসমান চুলের প্রতি কটাক্ষটা হজম করে স্রেফ "না, ও তেমন কিছু
নয়" বলে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু
আমাদের চাওয়া না চাওয়ার উপর তো সব সময় দুনিয়াটা নির্ভর করে না তাই বুঝি ঠিক এইসময়ে ঘরে ঢুকলেন প্রৌঢ় শিক্ষক অবিনাশবাবু।
ঘরে
ঢুকেই উনি শ্যামলবাবুর প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দিয়ে দিলেন: "হয়েছে আবার কি -- সেই পুরোনো রোগ -- ভূদেব মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে সেই অধ্যয়ন বলে ছেলেটা টুকলিবাজ। তাই
তাকে ধরতে গিয়েই যত বিড়ম্বনা। খানিক
আগে পরীক্ষা চলাকালীন ছেলেটার যা চিরুনি তল্লাশী করলো -- কিন্তু আখেরে লাভ হলো অষ্টরম্ভা।"
অবিনাশবাবু
যেভাবে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কথাগুলো বললেন তাতে ভূদেববাবু ভালোই বুঝতে পারলেন যে তিনি কলিগদের কাছে উপহাসের পাত্র হয়ে উঠেছেন এই ব্যাপারটা নিয়ে।
ইতিমধ্যে
কখন হাজির হয়েছেন ইতিহাসের শিক্ষক রমাকান্তবাবু। তিনি
ঘরে ঢুকে যেন জোরগলায় ঘোষণা করলেন: "ভূদেব, তুমি আজকে যা একখান খেল দেখালে ... ছেলেটার স্ট্রিপ সার্চ করাটুকু যা বাকি রেখেছিলে।"
সত্যি
আজকে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন ভূদেববাবু। তিনি
নিজেও মনে মনে ভীষণ লজ্জিত বোধ করছেন। যেভাবে
ছাত্রটার পেন্সিলবাক্স, জামা প্যান্টের পকেট, এমনকি মোজার ভিতরগুলোও উনি চেক করলেন সেরকম হয়তো না করাটাই বাঞ্চনীয় ছিল। বিশেষ
করে এতো খানা-তল্লাশী করেও যখন কিছু পাওয়া গেলো না ছেলেটার কাছে। আসলে
আজকে অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষ দিন তো তাই বুঝি ভূদেববাবু খানিকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন।
তবে
অন্যান্য শিক্ষকদের কথা শুনে ভূদেববাবু এটাও বুঝতে পারলেন যে অধ্যয়ন নামক ছাত্রটি টুকলি করছে কিনা সেটা অনুসন্ধান করার সময় প্রচুর দর্শক জুটেছিল। ক্লাসে
উপস্থিত ছাত্ররা তো বটেই সাথে ছিল এই বুড়ো শিক্ষকগুলোও। ভূদেববাবু
অন্বেষণ করতে এতখানি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে ওনাকে যে এতো জোড়া চোখ অনুসরণ করছে সেটা উনি বুঝতে পারেননি।
যাই
হোক, এখন তো আর কিছু করার নেই। এতো
চেষ্টা করেও যখন অধ্যয়নের কোনো দোষ ধরা পড়েনি তখন আপাতত এই সমস্ত ঠাট্টা বিদ্রূপ মেনে নেওয়া ছাড়া ভূদেববাবুর আর কোনো রাস্তা নেই। তাই
মুখ বুজে চুপ করে থাকলেন তিনি।
কিন্তু
এই সাম্প্রতিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও ভূদেববাবু কিছুতেই ঝেড়ে ফেলে দিতে পারেন না তার দৃঢ় বিশ্বাস কে। তিনি
নিশ্চিত অধ্যয়ন কোনো না কোনো অসৎ উপায়ে ইদানিং পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাচ্ছে।
আরেকবার
ভূদেববাবুর চিন্তার স্রোত ভেঙে যায় অবিনাশবাবুর কথায়: "হ্যাঁ, আমি মানছি অধ্যয়ন ছেলেটা আজকাল পরীক্ষায় অনেক নাম্বার পাচ্ছে -- যে ছেলে কিনা এক বছর আগেও ফেল করতে করতে নেহাৎ টিচারদের বদান্যতায় প্রমোশন পেয়েছে। তাছাড়াও
ভূদেবের কথা মতন আমি ক্লাস চলাকালীন অধ্যয়নকে প্রশ্ন করে দেখেছি ছেলেটা একদম কিচ্ছু উত্তর দিতে পারেনি কখনো, তাই সে ছেলেই যদি খাতা ভর্তি করে সঠিক উত্তর লিখে আসে সেটা সন্দেহজনক বৈকি! বিশেষ করে যাকে বলে কমা, দাঁড়ি সমেত একদম হুবহু বইয়ের উত্তরটা যেন ওর খাতায় ছাপা। এতো
যেন বাস্তবে একধরণের ভেল্কিবাজি! কিন্তু আমি বলি কি ..."
রমাকান্তবাবু
মাঝখানে বলে ওঠেন: "আমিও এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি -- ক্লাসে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে অধ্যয়ন উত্তর দিতে পারে না -- মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে? এরকম সহজ জবাব পর্যন্ত নয়। তবে
হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় 'আকবরের শাসন সম্বন্ধে যাহা জানো লেখো' এই প্রশ্নের উত্তরে ক্লাসে যেমনটি ওদের খাতায় লিখিয়ে দিয়েছিলুম ঠিক তেমনটি ওর উত্তরপত্রে লেখা দেখলুম। ঘটনাটা
আশ্চর্যজনক হতে পারে অবশ্যই তবে অবিশ্বাস্য বলে আমি অন্ততঃ মনে করি না। আমার
পিসতুতো ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় গোটা সেমিস্টার দেখতাম টো টো করে ঘুরে বেড়াতো, পড়াশুনার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই রাখতো না। সেমিস্টার
পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে পড়তে বসতো -- তার ছিল অসাধারণ মুখস্থ করার ক্ষমতা -- তাই দিয়ে সেমিস্টার পরীক্ষায় প্রচুর নম্বর পেতো -- এখন একটা আই.টি. কোম্পানিতে চাকরি করছে। দিব্যি
আছে। এই
অধ্যয়ন ছেলেটাও নিশ্চয়ই অদ্ভুত স্মৃতিশক্তির অধিকারী -- স্রেফ মুখস্থ করে ভালো নম্বর পাচ্ছে। জলের
মতো সোজা হিসেব।"
শ্যামলবাবুও
রমাকান্তবাবুর কথায় সায় দেন এবং সঙ্গে যোগ করেন: "আরো একটা ব্যাপার আমি খেয়াল করেছি, বাকি ছাত্ররা পরীক্ষার সময় মাঝে মাঝে কেমন উসখুস করে পাশের ছাত্রের থেকে উত্তর জানার জন্য বা উত্তর মিলিয়ে নেওয়ার জন্য -- তেমনটা কিন্তু হালফিলে বিন্দুমাত্র করতে দেখিনি অধ্যয়নকে। ও
সর্বদা চশমাচোখে খাতার দিকে চেয়ে থাকে, পাশের ছেলেদের থেকে উত্তর জানার জন্যে ঘাড় পর্যন্ত ঘোরায় না।" শ্যামালবাবুর
কথায় টিচার্স রুমের সকলেই সহমত জানায়।
এসকল
কথা ভূদেববাবুও মেনে নেন কিন্তু রাতারাতি অধ্যয়ন ছেলেটার এই "pauper to
prince" ট্রান্সফরমেশনটা
যেন কিছুতেই তিনি মেলাতে পারেন না। অধ্যয়ন
কি রীতিমতো পড়াশুনা করে বাজিমাত করছে নাকি আসলে সে এক মস্ত চালিয়াৎ? এই প্রশ্নটা গলার মধ্যে একটা কাঁটা হয়ে ফুঁটে আছে যেটা উনি গিলতেও পারছেন না আবার ওগরাতেও পারছেন না।
এদিকে
অবিনাশবাবু সুযোগ বুঝে আরেকবার মুখ খুললেন: "আহা, আমার কথাটা তো তোমরা শেষ করতে দিলে না। আমি
কিন্তু মনে করি এর পেছনে অন্য একটা কারণ আছে।"
"কি,
শুনি?" একটা সমবেত আগ্রহ ঝরে পড়ে এই প্রশ্নের মধ্যে।
অবিনাশবাবু
একটা রহস্যময় হাসি হেসে উত্তর দিলেন: "তোমরা কেও অধ্যয়নের আঙুলের দিকে নজর দিয়েছো?"
"আঙুলের
দিকে নজর? কই না তো?" উৎকণ্ঠিত হয়ে জবাব দেন ভূদেববাবু -- ওনার বুক ধুকপুক করতে থাকে, ওনার এতদিনের জিজ্ঞাসার উত্তর আছে বুঝি অবিনাশবাবুর কাছে।
"খেয়াল
করনি তো? খেয়াল করলে দেখতে অধ্যয়ন ইদানিং একটা আংটি পারছে। তাতে
কি ধরণের প্রবাল আছে সেটা এখনো ঠিক করে ধরতে পারিনি বটে তবে এইসব ধারণ টারণ করলে অনেকেরই চরিত্র পালটে যায় বুঝলে। অধ্যয়নের
সাথেও তেমনটা হয়েছে বলে আমার ধারণা।"
ভূদেববাবু
কিছু বলার আগেই ওনার মনের কথাটাই যেন ফুটে উঠলো বিজ্ঞানের শিক্ষক পার্থবাবুর মুখে: "ধুস! কি যে বলেন না অবিনাশদা। এসব
আবার হয় নাকি? যত্তসব ছেলেভুলানো কথা।"
অবিনাশবাবু
তো রেগে কাঁই: "তোমরা আজকালকার ছোকরারা নিজেদের সবজান্তা বলে মনে করো তাই না? আমি এমন কতো হতে দেখেছি চোখের সামনে। এই
তো আমার ভাগ্নেটা ..."
আবার
অবিনাশবাবুর কথায় ছেদ পড়ে টিচার্স রুমে স্পোর্টস টিচার রমেনবাবুর পদার্পণে। রমেনবাবুকে
সাধারণতঃ টিচার্স রুমে দেখা যায় না, স্পোর্টস রুমটাই ওনার প্রিয় বাসস্থান। তবে
বিকেলের এই সময়টায় টিচার্স রুমে চা দিয়ে যাওয়ার কথা স্কুল পিওনের -- আর এই চায়ের মোহই মাঝে মাঝে এই সময়ে রমেনবাবুকে টেনে নিয়ে আসে টিচার্স রুমে।
"কি
রমেন, তোমাকে এতো খুশি খুশি দেখাচ্ছে কেন? অবশ্য তোমার তো খুশি না থাকার কোনো কারণ নেই -- তোমাকে তো আর আমাদের মতো এখন কিছুদিন পরীক্ষার খাতা দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে না।" -- ফুট
কাটলেন অবিনাশবাবু।
অবিনাশবাবুর
তেরছা মন্তব্যটা গায়ে না মেখে রমেনবাবু উৎসাহের সঙ্গে উত্তর দিলেন: "আজকে তো অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল তাই ছেলেরা দেখলাম পরীক্ষা শেষে মাঠে হাডুডু খেলছে। এই
প্রো কাবাড্ডি লিগটা যবে থেকে টিভিতে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে তবে থেকে দেখছি ছেলেদের মধ্যে এই খেলাটার পসার বাড়ছে। এই
একটু আগেই দেখলাম অধ্যয়ন বলে ছেলেটা অপোনেন্টের একটা ছেলের পা ধরে যেভাবে ট্যাকল
করলো সেটা একেবারে যাকে বলে বাঁধিয়ে রাখার মতো।"
"দেখুন
ভূদেববাবু, আপনার প্রিয় ছাত্র তো কাবাড্ডি খেলায় একদম চ্যাম্পিয়ন।" মন্তব্য ছোঁড়েন
কোনো এক টিচার।
কিন্তু
এই মন্তব্যে দৃকপাত করলেন না ভূদেববাবু। একটা
চিন্তা হঠাৎ তার মাথায় এসেছে। তিনি
রমেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন: "আচ্ছা, অধ্যয়ন কি চশমা পরেই কাবাড্ডি খেলছে?"
রমেনবাবু:
"কই না তো? আমি তো অধ্যয়নকে কোনোদিন চশমা পরে কোনো খেলা খেলতে দেখিনি।"
ভূদেববাবু
এই শুনে হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ওনার
এইভাবে বেরিয়ে যাওয়ার আকস্মিকতায় বাকিরা খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন কিন্তু তারপর বাকিরাও হুড়মুড় করে রুম থেকে বেরিয়ে আসেন -- নিশ্চয়ই আরেকটা কোনো কান্ড ঘটাতে চলেছেন ভূদেববাবু।
অধ্যয়ন
খেলা নিয়ে মেতে থাকায় ভূদেববাবুকে আসতে দেখেনি। ভূদেববাবু
যখন তার কাছে গিয়ে তার চশমাটা দেখতে চাইলো সে খানিকক্ষণ বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকলো। কিন্তু
শিক্ষকের আদেশ অমান্য করার সাহস না থাকায় অধ্যয়ন ব্যাগ থেকে বের করে চশমাটা ভূদেববাবুর হাতে তুলে দেয়। ভূদেববাবু
চশমাটা হাতে নিয়ে দেখেন চশমাটা আর পাঁচটা সাধারণ চশমার মতোই দেখতে তবে ওজনে তুলনামূলকভাবে বেশ ভারী। এরপর
চশমাটা চোখে দিতেই ভূদেববাবুর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটা উল্লাসধ্বনি: "ইউরেকা!"
বাকি
টিচাররা ততক্ষণে ভূদেববাবুকে ধাওয়া করে মাঠে হাজির। তারা
ভূদেববাবুকে ঘিরে ধরলেন এবং নিজেরাও একে একে চশমাটা পরে দেখলেন -- ব্যাপারটা এতক্ষণে সকলের কাছেই জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো। আসলে
এই চশমাটা সাধারণ চশমা নয় -- এটা হচ্ছে আধুনিকতম গুগল গ্লাস। এই
চশমার কোনে একটা ক্যামেরা আছে, একটা ছোট্ট ডিসপ্লে স্ক্রিন আছে, ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযোগ করার ব্যবস্থা আছে, উপরন্তু এর ভেতর একটা চিপ আছে যার মেমরিতে যে কোনো ডাটা রেকর্ড করে রাখা সম্ভব। স্কুলের
বই, ক্লাস নোটসের খাতা -- সমস্তর ছবি আগে থেকে তুলে রাখতো অধ্যয়ন এই চশমার সাহায্যে এবং পরীক্ষার হলে সেই সব ছবি ফুটে উঠতো তার গুগল গ্লাসের ডিসপ্লে স্ক্রিনে -- তারপর তা দেখে উত্তর লেখা তো যে কারুর কাছেই ছেলেখেলা।
এরপর
ভূদেববাবুকে ঘিরে হৈচৈ পড়ে যায় শিক্ষকদের মধ্যে। ওনার
নাছোড়বান্দা স্বভাবের দৌলতেই তো অধ্যয়নের টুকলি করার রহস্যটা উন্মোচিত হলো। এই
সব টেকনোলজির অপব্যবহার যাতে ছাত্ররা ভবিষ্যতে না করতে পারে সেই নিয়ে আরো সজাগ থাকার ব্যবস্থা যে করা উচিৎ এই বিষয়ে সকলেই সহমত হন।
"দেখলেন
তো অবিনাশদা -- রহস্যটার শেষমেশ একটা বৈজ্ঞানিক সমাধানই বেরলো, আপনার ওই সব আংটি-ফ্যাংটি স্রেফ গুলতাপ্পি।" ভিঁড়ের ভেতর
থেকে বলে ওঠে কেও।
বক্তা
কে সেটা ঠাওর করতে না পেরে বোধহয় উপস্থিত সমগ্র শিক্ষককুলকে উদ্দেশ্য করে অবিনাশবাবু বলে উঠলেন: "হুঁ!"