আজকে বিশ্ব মাতৃভাষা দিবসের শুভেচ্ছা জানাই সবাইকে।
নানারকম চিন্তার মধ্যে নিজে লেখার টাইম পাচ্ছি না, তাই পাঠকদের চাঙ্গা রাখতে নিশানের ঝুলি থেকে আরেকটা গল্প ঝেপে দিলাম। এই লেখাটায় নিশানের "signature ভাষার" ব্যবহার কম থাকায় ওর লেখাটা অবিকল রইলো।
মেরি কম
মেরি কম নাম কেন দিলাম জানি না, গপপোটা মেরিবিস্কুট কম পড়ারও নয়, আবার অ্যাথলেট কে নিয়েও নয়। যদিও গপপোটা মেরিবিস্কুট নিয়ে। খুব কম কিছু, মূলতঃ দুখানা মেরি বিস্কুট নিয়ে। নরেন্দ্রপুর কলেজে পড়ি তখন, সম্ভবতঃ এগারো ক্লাসের শেষ দিক। আমি থাকতাম গৌরাঙ্গ ভবনে। আমরা অনেকে থাকতাম গৌরাঙ্গ ভবনে। ২৫০ জন। সে যাই হোক, এ গপ্পের নায়ক ক্যাওড়া কুমার, ঘোষাল আর অমর্ত্য।
আমাদের কারেণ্ট চলে গেলে, জেনারেটর চলতো রাত্তির এগারোটা অব্দি। বারান্দার আলো জ্বলতো, ঘরের আলো জ্বলতো না। সেই বারান্দার আলোয় আমাদের মুত্তু খালিগায়ে, বারান্দা বিদ্যাসাগর হয়ে, ভয়ানক ভয়ানক ইণ্টিগ্রেশন করছিলো।
পাশের ঘরে, মোমবাতির আলোয় ঘোষাল, যার গায়ে প্রচুর লোম, এবং বগলেও (প্রসঙ্গত আমার ঘোষাল নামে আরেক বন্ধু আছে, তার গায়েও প্রচুর লোম, বোধহয় ঘোষালদের গায়ে প্রচুর লোম হয়), সে মোমবাতি জ্বালিয়ে মনোযোগ সহকারে দুখানা ব্রিটানিয়া মেরি বিস্কুট পোড়াচ্ছিলো।
পাশে দাঁড়িয়ে অমর্ত্য চিরাচরিত ভঙ্গিতে বুড়ো আঙুল চুষতে চুষতে গোটা ঘটনাটা দেখছিলো।
পোড়ানো শেষ, অতএব অমর্ত্য একখানা কার্বন কালো বিস্কুট নিয়ে হাঁটা দিলো কামড়ির ঘরের দিকে, সন্ধের প্রেয়ার শেষ হয়েছে বেশীক্ষণ হয়নি, আমরা তখনও ধুতি ছাড়ার সময় পাইনি।
কামড়ির ঘরে গিয়েই অমর্ত্য সেখানা তুলে ধরেছে কামড়ির সামনে, বলছে খেয়ে দেখ দারুণ জিনিস। কামড়ি জানে অমর্ত্য মোটে সুবিধার জিনিস না, এদিকে বিকেলবেলা অমর্তযর বাড়ির লোক এসেছিলো, পিঠে ফিঠে হতে পারে, অন্ধকারে হাতে ধরে আবার জিনিসটা গরম গরম ঠেকছে। মনে বিস্তর ডিলেমা, তাও সাহস সঞ্চয় করে এক কামড় দিয়েছে।
দিতেই চিত্তির, অমর্ত্য অবশ্য এক সেকেণ্ডও দাঁড়ায়নি।
এদিকে দ্বিতীয় বিস্কুট নিয়ে ঘোষাল গেছে মুত্তুর সামনে। সেই মুত্তু যে কিনা তখন বড় বড় ইণ্টিগ্রেশন করে আর আমরা ডিফারেন্সিয়েশন করতে জানি না, যে কিনা তখন ভবিষ্যতের, আজকের বর্তমানের ভারতবর্ষের স্বঘোষিত শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ, এবং যে হাঁ করে ঘুমোনর সময় মুখে একবাটি নুন ঢেলে দিলেও দুবার ঠোঁট চেটে ফের ঘুমিয়ে পড়ে, তার সামনে। প্রসঙ্গত মুত্তুর গায়েও প্রচুর লোম, অর্কুটের ছবিতে ছিলো।
যাইহোক ঘোষাল মুত্তুর সামনে গিয়ে ক্রমাগত বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে, "অ্যাই মুত্তু দেখ না খেয়ে, দেখ না, দেখ না, ব্রিটানিয়া নতুন মেরী বার করেছে দারুণ খেতে।"
মুত্তু বলছে "আরে যা না রে বাবা। বিরক্ত করিস না তো!!" ঘোষালও নাছোড়বান্দা। ঘোষাল বলছে "আরে দেখ না, আমিই খেয়ে দেখাচ্ছি, আঁ আঁ..." বলেই মুখ হাঁ করে বিস্কুট খানা ধরে, কামড় দেবে আর কি, তা, পেছনে ছিলো ক্যাওড়া কুমার।
তার দুদিন আগেই ঘোষাল খেলা থেকে ফিরে ঘেমো বাহুমূল ঘষে দিয়েছিলো ক্যাওড়ার মুখে, ক্যাওড়া তাকে গালিগালাজ করতে গিয়ে আমাদের ওয়ার্ডেন আগা খাঁ এর কাছ থেকে শুনেছে, যে আগা খাঁ র চশমা ছিলো হরলিকসের শিশির পেছনের কাচের মত, আর যে হারমোনিয়াম রিড দেখে দেখে বাজাতো, তায় দেখতো না ভালো, অতএব ভয়াবহ বাজনা, তবলায় তাল দিতে নাভিশ্বাস উঠতো আমার, আর গলা ছিলো বাজখাঁই, সেই আগা খাঁর কাছ খেকে ক্যাওড়া শুনেছে তার ভাষা "রিকশাওলাদের মত" ইত্যাদি। অতএব সে প্রতিশোধস্পৃহায় তককে তককেই ছিলো।
অতএব বিন্দুমাত্র না থমকে, পেছন থেকে ঘোষালের মাথায় এক চাঁটি। এমন চাঁটি যার গুঁতোয় ঘোষাল খেলো দাঁতকপাটি, আর ঐ বিষ মেরী ওর মুখে।
থু থু করে ছিটিয়ে দিয়েই ঘোষাল ধাওয়া করলো ক্যাওড়াকে।
ধান ভানতে প্রচুর শিবের গীত করে ফেললাম, সে যাই হোক।
ঘোষাল আর অমর্ত্য আজ দুজনেই আমাদের মধ্যে নেই, মাঝে মধ্যে মনে হয়, হয়তো এভাবেও মনে রাখা যায়।