Monday, July 31, 2017

সম্প্রতি ফেসবুকের দৌলতে জানতে পারলাম আমার বি.টেক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ -- হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি -- সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের খেতাব অর্জন করেছে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় এই সংক্রান্ত যে খবরটি বেরিয়েছে তার লিংক এই লেখার শেষে দিলাম।

হেরিটেজ কলেজের বরাবরই দেখেছি লেখাপড়ার মান উন্নত করার দিকে নজর আছে। তাই আইআইটি খড়্গপুর, আইএসআই কোলকাতা, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি বা শিবপুর কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপকদের HoD, Dean বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করে থাকে হেরিটেজ কলেজের কর্তৃপক্ষ। এঁনারা যে ক্লাসগুলি নেন তাদের গুণমানও হয় অসাধারণ।
আমি পড়াকালীন যিনি কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন, তিনিও অন্য কলেজ থেকে অবসর নেওয়ার পর হেরিটেজে জয়েন করেছিলেন। তাঁর বয়সও হয়েছিলো ভারী। স্যার মাথা নিচু করে কাজ করার সময় কেও ওঁনাকে ডাকলে ওঁনার মাথা তুলে তাকাতে সময় লাগতো পাক্কা এক মিনিট -- এই কারণে এই স্যারের ডাকনাম ছিলো একটি জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার নাম -- কল হো না হো।

Sunday, July 30, 2017

মিশন: পর্ব ৭

আজকে যে ঘটনাগুলি সম্বন্ধে লিখতে চলেছি সেগুলি ঘটেছিলো উচ্চ মাধ্যমিকের সময় কেমিস্ট্রি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার দিন। সেদিন পরীক্ষার শুরুতেই প্রত্যেক ছাত্রকে একটি করে খাতা ধরিয়ে দেওয়া হয় -- প্রত্যেক খাতার একটি unique নাম্বার ছিলো যা দেখে কোন ছাত্রের খাতা তা সহজেই সনাক্ত করা যায় এবং প্রত্যেক খাতার উপর ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা লেখা ছিলো। সেই সংখ্যা অনুযায়ী লবণ (Salt)-এর নমুনা সংগ্রহ করে তার মধ্যে কি cation ও anion আছে তা নির্ধারণ করতে হবে আমাদের। আমি আমার খাতাটা নিয়ে গিয়ে ল্যাবরেটরির একটি টেবিলে রেখে বাইরে আসি ব্যাগ থেকে পেন্সিল বাক্স আনার জন্য। ইতিমধ্যে আমার সহপাঠী বিপ্লব মাঝি সেই টেবিলের উপরে নিজের খাতাটি রেখে সেও বাইরে আসে। এদিকে আমি ফিরে এসে অসাবধানতাবশতঃ তার খাতার উপর নিজের নাম লিখে দিই। এরপর বিপ্লব ফিরে এসে আমার ভুল ধরতে পেরে হুলুস্থুলু বাধিয়ে দেয়। অতঃপর আমরা মিশনের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের হেড স্যারের দ্বারস্থ হই আমার ডেকে আনা বিপদ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য। এই স্যার সম্বন্ধে প্রচলিত যে তিনি খুব জ্ঞানী কিন্তু মানুষ হিসেবে মোটেও সুবিধের নয়। বিপ্লব কাঁদো কাঁদো গলায় স্যারকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলে পর স্যার আমাদের সান্ত্বনা দিয়ে জানান যে এই ছোটোখাটো ঘটনার জন্য আমাদের চিন্তার কিছু নেই। বিপ্লব বেচারির কোনো দোষ নেই কিন্তু আমারও চিন্তার কিছু নেই শুনে আমি স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লাম, মনে মনে ভাবলাম সবাই হেড স্যারকে নিয়ে ফালতুই নিন্দে করে -- আমার চোখে উনি তখন দেবতুল্য পুরুষ। এরপর হেড স্যার আরেকটি বাক্য উচ্চারণ করেন: "পরের বছর না হয় আরেকবার কেমিস্ট্রি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষাটা দিও।" এই শুনে তো আমি চোখে অন্ধকার দেখি।

এ হেন দুঃসময়ে মানুষের দুঃখ লাঘব শুধুমাত্র তখনই হয় যখন সে দেখে তার চেয়েও কষ্টে কেও আছে। সেই মুহূর্তে হেড স্যারের কাছে উপস্থিৎ আমার আর এক সহপাঠী -- অর্ণব। আমাদের ব্যাচে পাঁচজন অর্ণব ছিলো (আর ছয়জন অনির্বাণ), তাই অনিচ্ছাসত্বেও অর্ণবের ডাকনামটাই এই লেখায় ব্যবহার করছি -- কামড়ি। কামড়ি উচ্চ মাধ্যমিকের অরিজিনাল admit কার্ড না নিয়ে এসে তার ফটোকপি নিয়ে এসেছিলো। সেই দেখে হেড স্যারের উক্তি: "ও, প্রাকটিক্যাল পরীক্ষাটা বুঝি আসল পরীক্ষা নয় তাই xerox নিয়ে এসেছো?" এরপর স্যার জানান যতক্ষণ না কামড়ি অরিজিনাল admit কার্ড দেখাবে ততক্ষণ ওর খাতা জমা নেওয়া হবে না। এই শুনে কামড়ির আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। সে যুগটা মোবাইল ফোনের ছিলো না। অফিস থেকে বাড়িতে বারবার ফোন করতে থাকে কামড়ি admit কার্ড জোগাড়ের উদ্দেশ্যে। আমি অনেক পীড়াপীড়ি করায় স্যার নিমরাজি হয়ে আমাকে পরীক্ষায় বসতে দেন। কামড়ির পরিবার পরদিন admit কার্ড নিয়ে আসলে পর সেইদিন তার খাতা জমা নেন স্যার।

এই ঘটনাবহুল দিনের কথা এখানেই শেষ নয়। আমাদের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে কমবয়সী, খুব ছাত্রদরদী এক স্যার ছিলেন। লবণের উপাদান নির্ধারণ করার পর সেই স্যারের কাছে গিয়ে লবণ সমেত টেস্ট টিউবটি দেখলে পরে স্যার সঠিক না বেঠিক নির্ধারণ হয়েছে তা বলে দিতেন। ভুল করলে পর স্যার সরাসরি উত্তর না বলে দিয়ে cation বা anion টা আরেকবার পরীক্ষা কর এটা বলতেন। তো অন্যান্য ছাত্রের দেখাদেখি আমাদের এক সহপাঠী সেই স্যারের কাছে গিয়ে নিজের টেস্ট টিউবটি দেখিয়ে লবণের নামটি বলে। স্যার দেখেন টেস্ট টিউবটি সম্পূর্ণ ফাঁকা অর্থাৎ ছাত্রটি রসায়ন পরীক্ষার সময় পুরো লবণটি শেষ করে ফেলেছে। সেই ফাঁকা টিউবটি হাতে নিয়ে স্যার বলেন: "বাবা, আমি অনেকদিন কেমিস্ট্রি চর্চা করছি ঠিকই কিন্তু ফাঁকা টেস্ট টিউব দেখে বলে দেব তার ভেতর আগে কি ছিলো অতখানি বিদ্যা এখনো আয়ত্ত করে উঠতে পারিনি।"

Sunday, July 9, 2017

অনেকদিন ধরে ভাবছি কোনো এক পুণ্য তিথিতে এই লেখাটা বাজারে ছাড়বো (অর্থাৎ ফেসবুকে পোস্ট করবো)। সম্প্রতি রথযাত্রা, ঈদ, উল্টোরথ পেরিয়ে গেলো কিন্তু আমি কাজের ফাঁকে সময় বার করে উঠতে পারলাম না। অগত্যা দিন-ক্ষণ-পাঁজি মুলতুবি রেখে আজ খানিক অবসর বার করে লেখাটা আপনাদের সামনে পেশ করছি।

লেখক: পর্ব ২০

বেঙ্গালুরুতে ISKCON-এর একটি বড় শাখা আছে। সেখানে গিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশ করে দেখি দেবতা দর্শনার্থে সামনে দু'টি লাইন -- একটি বড়, অপরটি ছোট। অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে অভ্যাস বশে ছোট লাইনটির পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ছোট লাইনটির প্রথম যে বিশেষত্বটি চোখে পড়লো সেটি হলো মেঝেতে চৌকো চৌকো ঘর আঁকা আছে এবং লোকজন সেই চৌকো ঘরগুলির উপর পা রেখে রেখে এগোচ্ছে। এক দু'ধাপ অগ্রসৱ হওয়ার পর দেখি আমার সামনের লোকটি তাঁর সম্মুখে ফাঁকা জায়গা থাকা সত্ত্বেও আর এগোচ্ছেন না। খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাঁকে এবং সামনে অন্যান্য ভক্তদের পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারলাম এই লাইনটি ছোট হওয়ার পেছনে কি রহস্য লুকিয়ে আছে। এই লাইনে দাঁড়ানোর নিয়ম হচ্ছে প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিচে লেখা স্তবকটি একবার করে গেয়ে তারপর এক ধাপ সামনে এগোতে হবে:
"হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
 হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।"
মন্দিরের ভিতর মাইকে সর্বদা এই দু'টি লাইন গেয়ে শোনানো হচ্ছে এবং ভক্তবৃন্দ সেই তালে তালে গেয়ে চলেছেন। মনে মনে বা আস্তে আস্তে গান গাইলে কিন্তু চলবে না। দেয়ালে নির্দেশাবলীতে লেখা আছে গান অন্ততঃ এতখানি জোরে গাওয়া উচিৎ যাতে নিজের আওয়াজ নিজের কানে পৌঁছোয়। অতো লোকের মাঝে গাইতে হলে স্বাভাবিকভাবেই ডেসিবেলের মাত্রাটা খানিক না বাড়ালে এই নির্দেশ মান্য করা সম্ভব নয়। উপরন্তু ১০৮খানি ধাপ আছে এই লাইনে। এদিকে ফিরে আসারও আর সুযোগ নেই কেননা আমার পেছনে অন্যান্য ব্যক্তি ইতিমধ্যে লাইন দিয়েছেন। অগত্যা আমিও আওড়াতে শুরু করলাম:
"হরে কৃষ্ণ, হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
 হরে রাম, হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।।"