Sunday, August 31, 2014

মিশন: পর্ব ৪

ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড এখন সিলেবাসে অনেক সংশোধন করেছে, পরীক্ষার ধরণও আর আগের মতো নেই -- আশা করি এই সব রদবদলের ফলে পড়াশুনার মান উন্নত হয়েছে। আমাদের সময়ে কিন্তু ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ডের যথেষ্ট দুর্নাম ছিল কিছু কিছু সাবজেক্টের ক্ষেত্রে -- quantity over quality -- এই মত পোষণ করার জন্য। যেমন ধরুন, বাংলা বা ইতিহাস পরীক্ষায় যে যত বেশি পাতার খাতা জমা দেবে সে তত বেশি নম্বর পাবে, লেখার মান এই সব সাবজেক্টে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার সেই অঙ্কের স্যার, সুকুমার রায়, এই নিয়ে একটা মজার গল্প বলতেন।

একজন ইতিহাসের পরীক্ষক পরীক্ষার খাতা ঘরে এনে একটা নিচু টুলের উপর রাখতেন, দিয়ে ছেলেকে ডেকে বলতেন: "অ্যাই পল্টু, একটা লাথি মেরে যা তো !" পল্টু একটু দূর থেকে ছুটে এসে সেই খাতার বান্ডিলে মারতো এক লাথি; এর ফলে যেই খাতাগুলো বেশি ভারি সেগুলি সামনে পড়ে থাকতো আর হালকা খাতাগুলি ছিটকে গিয়ে দূরে পড়তো। এভাবে খুব সহজেই সেই পরীক্ষক ওজনের উপর ভিত্তি করে খাতাগুলোকে আলাদা করে ফেলতেন; তারপর আর কি, খাতার স্থূলত্ব অনুযায়ই নম্বর জুটতো ছাত্র ছাত্রীদের ভাগ্যে।

এই পাতা ভরানোর জন্যে অনেক ছাত্র ছাত্রী কি করতো, উত্তরের শুরু আর শেষটা ঠিক রেখে মাঝখানে হাবিজাবি কিছু একটা লিখে দিত, "আমি আজ বাজারে গেছিলাম; আজ আলুর দর তিরিশ টাকা প্রতি কিলো, পটলের কুড়ি টাকা, ঝিঙের চল্লিশ টাকা" -- এ জাতীয় কিছু একটা আর কি। অনেক পরীক্ষকই প্রচুর খাতা চেক করতে গিয়ে উপর উপর চোখ বোলানোর বেশি আর কিছু করতেন না, তাই এই সকল ছাত্র ছাত্রীর মধ্যে কেউ কেউ, ভাগ্য ভালো থাকলে, এসব লিখে নম্বরও ভালো পেত।

মিশনে কিন্তু সব সাবজেক্টের খাতাই ভালো করে দেখতেন মাস্টারমশাইরা। ব্যতিক্রম ছিল একটি মাত্র বিষয় -- Indian Culture, সংক্ষেপে IC। যারা মিশনে পড়েননি তারা বোধহয় এই সাবজেক্টটির নামও শোনেননি। তাদের জন্যে বলছি, এই বিষয়ের ক্লাসে পড়ানো বিভিন্ন মহামানবের জীবনী, তাদের বাণী, (ছাত্রদের মতো করে লেখা) কিছু ধর্মগ্রন্থের নির্যাস, আধ্যাত্মিক দর্শন, ইত্যাদি। এই বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর বাকি সাবজেক্টের নম্বরের সাথে যোগ করা হতো না ঠিকই, কিন্তু এই সাবজেক্টে পাস করা ছিল বাধ্যতামূলক। ছাত্রাবস্থায় সাবজেক্টটা কঠিন লাগার ফলেই হোক কিম্বা শুধুমাত্র পাস করার লক্ষ্য নিয়ে পড়াশুনা করার মানসিকতার ফলেই হোক, বেশির ভাগ ছাত্র পরীক্ষার হলে গিয়ে কি লিখবে ভেবে পেত না। স্বাভাবিক ভাবেই, খাতা ভরানোর উদ্দেশ্যে ছাত্রেরা মনের মাধুরী মিশিয়ে কিছু একটা উত্তর লিখে দিয়ে আসতো, এবং অধিকাংশ সময় পারও পেয়ে যেত।

একদিন গবা মহারাজ ক্লাসে এসে ছাত্রদেরকে বললেন: "তোদের বন্ধু 'অমুক' IC পরীক্ষায় কি লিখেছে শোন।"
প্রশ্নটা ছিল আমাদের গুরুদেব ও গুরুপত্নি উভয়েই বর্তমান এরকম একটা স্মরণীয় ঘটনা লিখতে হবে, এর উত্তরে 'অমুক' যা লিখেছিল তার খানিকটা অংশ উদ্ধৃত করে নীচে দিলাম:
"গুরুদেব গুরুপত্নিকে একান্তে ডেকে বললেন: 'আই লাভ ইউ।'
গুরুপত্নি কম্পিত কণ্ঠে উত্তর দিলেন: 'আই লাভ ইউ টু।' "
এই উত্তরটি পাঠ করার শেষে গবা মহারাজ বলেন: "তোরাই বল, আমি এখন কি করবো ?"
পিছনের বেঞ্চ থেকে একটি উত্তর আসে: "মহারাজ, ওর উত্তরটা আরেকবার পড়ে শোনাবেন !"


Courtesy: ছেলেটার ভালো নামটা এখন মনে পড়ছে না, তবে ওর ডাকনামটা আমরা দিয়েছিলাম "মাওবাদী"। এই নামকরণের ইতিহাস আর ওর কাছে শোনা অন্যান্য মিশনের গল্প পরে লিখবো'খন।

Saturday, August 30, 2014

গবা মহারাজের কান্ডকারখানা লিখে পাঠকদের কাছ থেকে ফেসবুকে যে পরিমাণ সাড়া পেয়েছি, তা আগে কখনো পাইনি। তাদেরই মধ্যে কিছুজনের বক্তব্য (তাদেরই ভাষায়) আলাদা করে উল্লেখ করার দাবি রাখে, সেগুলি নীচে দেওয়া হলো:

১) গেছো দাদা (এটাই যদি কারুর ফেসবুকে পোশাকি নাম হয়, আমি কি করতে পারি !)
বালতির গপ্পোটা আমার কেমিস্ট্রি টিউটর সুজয় পট্টনায়েকের থেকে শোনা -- সত্যি বলতে কি, গপ্পোটার একটা বাড়তি ব্যপার আছে। বালতি চাপা দিয়ে দু'চারটে চড়-থাপ্পড় মারার পরে গবা চ্যাঁচাতে থাকেন - "যার বালতি, তাকে টিসি দেবো।" আলো আসার পরে দেখা যায়, যে বালতিটা গবার নিজেরই।

২) নিশান
আমি গবাকে গাল দেবো না, গবার কল্যাণে আমি বাইমান্থলি পরীক্ষা না দিয়ে বাড়ি কেটে পড়তে পেরেছিলাম, ১০৬ জ্বরের অজুহাত দেখিয়ে !

৩) সৌম্যদীপ
একদিন আমাদের একটা বন্ধু কিছু দুষ্টুমি করেছে আমাদের হোস্টেলে। তা সেই সময় গবা খবরটা পেয়ে ওই ছাত্রের ঘরে ঢুকেই তাকে পেটাতে আরম্ভ করলো।
ছাত্র: "মহারাজ, মারছেন কেন ? আমি কিছু করিনি। আপনি একটা 'গান্ডু' -- এটা জানেন ?"
গবা: "সে না হয় মানছি আমি 'গান্ডু' -- তা বলে ওরকম ভাবে বলার কি আছে ?"

Friday, August 29, 2014

মিশন: পর্ব ৩

গবা মহারাজকে ঘিরে বিভিন্ন কীর্তিকলাপের সাক্ষী আছি আমি। আরো অনেক ঘটনা মিশনের ছাত্রদের মুখে মুখে প্রচলিত। তার মধ্যে কিছুর বাস্তবিকতা নিয়ে পাঠকদের মনে সন্দেহ জাগতে পারে; তা সত্তেও সেরকম কিছু নমুনা আমি এখানে সংকলিত করছি, অত্যুৎসাহী পাঠকরা নিজ উদ্যোগে এগুলির যথার্ততা যাচাই করে নেবেন।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার admit card বানানোর জন্যে কিছু ছাত্র গড়িয়া গেছিল ছবি তোলাতে। তারা মিশনে ফিরে এসে ভবনে (অর্থাৎ hall-এ) ঢোকার সময় গবা মহারাজের মুখোমুখি পড়ে যায়।
গবা মহারাজ: "কি ব্যাপার ? একসাথে কোথায় গেছিলে ?"
এক ছাত্র: "মহারাজ, admit card-এর জন্যে ছবি তোলাতে।"
গবা মহারাজ: "তা এতজন মিলে যাবার কি দরকার, একজন গিয়ে সবার ছবি তুলে আনা যায় না ?"

আমাদের সময় মোবাইল, ল্যাপটপ -- এই সবের প্রচলন ছিল না, তাই ছাত্রদের ঘরে কোনো প্লাগ পয়েন্ট থাকতো না। এই পড়ে যদি কোনো পাঠকের অবাক লাগে তাহলে বলি আমার দাদা ক্লাস ৪ থেকে ১০ পুরুলিয়া মিশনে পড়াকালীন ছাত্রদের রুমে ফ্যান পর্যন্ত ছিল না। পুরুলিয়ার মতো গরমের জায়গায় ফ্যান ছাড়া থাকাটা কতোখানি উপভোগ্য সেটা একবার ভেবে দেখুন তো ! এখন অবশ্য এক প্রাক্তনীর টাকায় পুরুলিয়া মিশনে প্রত্যেক ঘরে ফ্যান লাগানো হয়েছে। পুরুলিয়া মিশনের কথা পরে আবার হবে'খন, আপাতত মূল কাহিনীতে ফেরা যাক। আমাদের মিশনে সেই সময় প্লাগ পয়েন্ট থাকতো ব্লাইন্ড ছেলেদের ঘরে। দুর্ভাগ্যবশত: ব্লাইন্ড ছেলেদের জন্যে ব্রেইল ভাষায় যথেষ্ঠ বই না থাকার দরুণ ওদের ক্যাসেটে পড়া রেকর্ড করে সেই শুনে পড়া মুখস্থ করতে হতো, তাই তাদের ঘরে প্লাগ পয়েন্টের ব্যবস্থা। কিছু ছাত্র এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্যে বাইরে থেকে VCP ভাড়া করে নিয়ে এসে তাতে হিন্দী সিনেমা দেখছিল। হঠাৎ রুমের কড়া নড়ে উঠলো, এক ছাত্র রুমের বাইরে এসে দেখে গবা মহারাজ দাঁড়িয়ে। এদিকে রুমের ভিতরে সিনেমা তখনো চলছে, পর্দায় হিরোইন একটা গান ধরেছে সবে।
গবা মহারাজ: "কি রে, তোরা এই রুমে কি করছিস ?"
ছাত্র: "মহারাজ, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতির মাঝে মনকে সতেজ রাখার জন্যে ভজন শুনছি।"
গবা মহারাজ: "বাহ্, এ তো খুব ভালো কথা। তোরা চালিয়ে যা।"
এই বলে মহারাজ চলে গেলেন। প্রসঙ্গত এই ছাত্রটি আমাদের বেলায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে প্রথম দশের মধ্যে স্থান অধিকার করেছিল।

কিছু কিছু ঘটনা প্রায় প্রত্যেক স্কুল কলেজেই থাকে যে ঘটনাটির কৃতিত্ব প্রত্যেক ব্যাচের ছেলেরাই দাবি করে যে তাদেরই কোনো এক সহপাঠীর। সেরকমই একটি ঘটনা হলো লোড শেডিং-এর সময় গবা মহারাজের মাথায় বালতি চাপা দিয়ে কোনো এক বিতশ্রদ্ধ ছাত্রের দু-চার ঘা বসিয়ে দেওয়া; শুরুতেই মাথায় বালতি চাপা দিয়ে দেওয়ার ফলে পরে গবা মহারাজ আর দোষী ছাত্রকে সনাক্ত করতে পারেননি, তাই ওনাকে ব্যাপারটা চুপচাপ হজম করে নিতে হয়।

লোড শেডিং-এর কথায় মনে পড়লো, মিশনের ছাত্রদের একটি স্বভাব হলো লোড শেডিং হলে পরেই চেঁচিয়ে ওঠা "এই গবা, আলো দিয়ে যা !" এই প্রসঙ্গে একটা গল্প (ঘটনা) শুনেছিলাম:
একবার বিদেশের একটি প্রেক্ষাগৃহে একটি নাটক চলছে, এমন সময় সেখানে লোড শেডিং। সেই অন্ধকারের মধ্যে কে একজন চেঁচিয়ে উঠলো: "এই গবা, আলো দিয়ে যা !" এই শুনে পেছন থেকে আরেকজন কে চেঁচিয়ে উঠলো: "আমি সেভেনটি ফোরের ব্যাচ, তুমি কোন ইয়ারের ?"

Tuesday, August 26, 2014

মিশন: পর্ব ২

মিশনে সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন মহারাজের ডাকনাম ছিল "গবা"। এই নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সেই সব প্রচলিত ব্যাখ্যার মধ্যে প্রধান তিনটি নীচে দেওয়া হলো।
১) সাধারণ ব্যাখ্যা: উনি আস্ত একটি "গবেট", তাই সংক্ষেপে "গবা"।
২) আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা: উনি ভগবানের অন্তসার খুঁজে পেয়েছেন তাই "গবা"। বুঝতে পারলেন না ? তবে এই দেখুন -- ভ(গবা)ন !
৩) বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: ভগবান + conc. HNO_3  -->  H(ভন)NO_3 (^) + গবা (v)
অর্থাৎ ভগবানের সঙ্গে কনসেন্ট্রেটেড নাইট্রিক অ্যাসিডের রিঅ্যাকশনে H(ভন)NO_3 গ্যাস উৎপন্ন হয় এবং "গবা" প্রেসিপিটেট হয়।
কি, শেষেরটা বড্ড বোকাবোকা হয়ে গেল ? আমাদের মিশনের ছেলেদের কিন্তু আজও এটা শুনলে হাসি পায়।

যাই হোক, গবা-কে নিয়ে গল্প পরের পর্বের জন্য তোলা থাকলো।

Monday, August 25, 2014

"Forgive and forget." "দয়াই পরম ধর্ম।"
এধরণের কথা আমরা প্রায়শই বলে থাকি। তবে কিনা শুধুমাত্র বলেই থাকি, এই কথাগুলোর যথার্ততার প্রমাণ দেওয়ার সময় তখন আমাদের অন্য রূপ; ছোটখাটো দোষও আমাদের মনে হয় ক্ষমার অযোগ্য, অতি অল্প কারণেই আমরা হয়ে উঠি প্রতিহিংসাপরায়ণ। আমার নিজের জীবনের একটি ছোট ঘটনাই তার পরিচায়ক।

লেখক: পর্ব ৪

ছোট বেসরকারী বাসে চেপেছেন নিশ্চয়ই -- মানে আমি সেই বাসগুলোর কথা বলছি যেগুলোর সিটের পরিসর খুবই কম। দু'জনের সিটে আদতে দেড়জন বসতে পারে, যদি না দু'টো বাচ্চা কিম্বা একেবারে তালপাতার সেপাইয়ের মতো ফিগারের দু'জন পাশাপাশি বসে। নতুবা ডানদিকের সিটের ধারে বসে থাকা যাত্রীর বাঁ পা আর অপরদিকে বাঁদিকের সিটের বসে থাকা যাত্রীর ডান পা বাইরে বেরিয়ে থাকবেই -- এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি। তবে সবচেয়ে অসুবিধে হয় যদি কেউ একদম শেষের সিটটিতে বসে। এই সিটটির মাপ স্বাভাবিক চেহারার পাঁচজনের ইয়ের চেয়ে সামান্য বেশি -- টেনেটুনে এটাকে 5 and a half seater বলা যেতে পারে, তার চেয়ে বেশি কখনোই নয়। কিন্তু খেয়াল করে দেখবেন "দাদা, একটু চেপে বসুন" বলে সেই সিটে ছয়জন যাত্রী বসবেই।
এই সিটে বসার একটা অলিখিত নিয়ম হচ্ছে যে প্রথম পাঁচ যাত্রী মোটের উপর একটু ভালো ভাবেই বসতে পারবে, পিছনের সিটে হেলান দিয়ে। তবে ষষ্ঠ যাত্রীকে সর্বদা সামনে ঝুঁকে বসে থাকতে হবে, সেই মুহূর্তে এই যাত্রীর আর সিটের মধ্যে সংস্পর্শ থাকবে সামান্যই। শেষ সিটের অন্য কোন যাত্রী সিট ছেড়ে উঠলে পরে বাকি বসে থাকা যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে একটু নড়েচড়ে বসে এই ষষ্ঠ যাত্রীটিকে ভালো ভাবে বসার ব্যবস্থা করে দেন; আর নতুন যে যাত্রী এই সিটে এসে বসে তাকে আগেরজনের মতো পিঠটা কুঁজো করে বসতে হয় -- নবীনকে সর্বদা প্রবীণের জন্যে এই কষ্টটা মেনে নিতে হবে, এটাই নিয়ম।

একবার আমি এইরকম এক পিছনের সিটে বসেছি -- ষষ্ঠ যাত্রী হিসেবে। খানিকক্ষণ পর আমার পাশের পাশের যাত্রীটি তার স্টপেজ এসে যাওয়ায় সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। এদিকে আমার পাশের যাত্রীটি কিন্তু এতোটুকুও নড়ার প্রয়োজন বোধ করলেন না, তাই অপর এক যাত্রী ভালো ভাবেই বসার সুযোগ পেয়ে গেলেন। অন্যের উপকারে আমার কি লাভ ? আমার মতো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী একজনের সামনের দিকে ঝুঁকে ওইভাবে বসে থাকাটা যে কি কষ্টের, সেটা একবার ভেবে দেখুন ! আমার তো পিঠ টনটন করছে; ওদিকে আরেকজন যাত্রী উঠে পড়লেন, এবারও আমার পাশের যাত্রীটি সরে বসলেন না একটুও।
হঠাৎ ওনার মোবাইলে ফোন আসায়, আমার পাশের যাত্রীটি টাইট প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইলটি বার করার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ান। আমিও সুযোগ বুঝে টুক করে নিজের বসার জায়গার দখল নিয়ে নিই। মোবাইলটা কানে দিয়ে ফের সিটে বসতে গিয়ে ভদ্রলোক বুঝতে পারেন ইতিমধ্যে ওনার কি ক্ষতি হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে ওনার মুখে বিরক্তির অভিব্যক্তিটি দেখে আমার যে কি যারপরনাই আনন্দ হয়েছিল তা আমি লিখে প্রকাশ করতে পারব না।

Saturday, August 16, 2014

চায়ের আসরে কথা হচ্ছে।
প্রথম পিএইচডি স্টুডেন্ট: "এক একটা থিসিস বাঁধাতে কতো খরচা জানিস? ৫০০ টাকা। ভাবছি নিজের কাছে রাখার জন্যে থিসিস আর বাঁধাবো না, প্রয়োজনে সফ্ট কপি থেকেই পড়ে নেব।"
দ্বিতীয় পিএইচডি স্টুডেন্ট: "নিজের থিসিসের অন্তত একটা হার্ড কপি রাখিস, ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েদের দেখাতে পারবি।"
প্রথম পিএইচডি স্টুডেন্ট: "তখন হয়তো ছেলেমেয়েরা আমার থিসিস দেখে বলবে, 'বাবা, তুমি এর জন্যে জীবনের এতগুলো বছর ব্যয় করলে? না করলে, আমরা তো কবেই হয়ে যেতাম।' "

Friday, August 15, 2014

"আমি বিপ্লবী। প্রাক্তন নই, আজীবন।" -- হেমচন্দ্র ঘোষ।
(স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম, পৃষ্ঠা ৭০)

Thursday, August 14, 2014

হায়ার সেকেন্ডারির বাংলা পরীক্ষা চলার সময় আমার দাদাকে পেছন থেকে এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল: "এই 'মহেশ'-টা কে? মানুষটা না গরুটা?"

***************

অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বাংলা প্রশ্নপত্রে মানে লিখতে দিয়েছে -- (প্রায়) সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক শব্দ: বৃত্ত আর বিত্ত।
পরীক্ষার হলে পেছন থেকে এক বন্ধু সন্দীপনকে জিজ্ঞেস করেছে বৃত্ত আর বিত্ত -- কার কি মানে।
সন্দীপন: "বৃত্ত মানে গোলাকার।"
বন্ধু: "আর বিত্ত?"
সন্দীপন: "ধন।"
বন্ধু: "প্লিজ, পরীক্ষার সময় এখন বাজে কথা বলিস না। তুই তাড়াতাড়ি বিত্তের মানেটা বল।"

Tuesday, August 12, 2014

একটা সুন্দর কথা পড়লাম ফেসবুকে:
"দুশ্চিন্তা কল্পনাশক্তির অপব্যবহার।"

Sunday, August 10, 2014

(এই কথাগুলো অনেকদিন ধরেই লিখবো ভাবছিলাম কিন্তু স্লো ইন্টারনেট কানেকশনের জন্যে লিখতে গিয়ে মাঝে মাঝে ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিলাম, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।)

কার্টুনিস্ট প্রাণ মারা গেছেন শুনে বড় দুঃখ পেলাম। ওনার সৃষ্ট চরিত্রগুলি -- চাচা চৌধুরী, সাবু, বিল্লু, পিঙ্কি, রমন, চান্নি চাচী -- আজও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল। এক সময় এরা ছিল আমার নিত্যকার সঙ্গী, এদের এক একটা বই আমি পাঁচ ছয়বার করে অন্তত পড়তাম। এদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র ছিল অবশ্যই চাচা চৌধুরী, যার মগজ কম্পিউটারের চেয়েও প্রখর। চাচা চৌধুরীর সব গল্পই, যাকে বলে, চেটেপুটে খেতাম; বিশেষ করে সেই সংখ্যাগুলো যেগুলোতে রাকা থাকতো -- পুরো বই জুড়ে টানটান উত্তেজনা অনুভব করতাম। অনেক বয়সেও আমি লুকিয়ে লুকিয়ে এই সব কমিকস পড়েছি। সাহারা টিভি চ্যানেলে চাচা চৌধুরীকে নিয়ে একটা টিভি সিরিয়াল হতো, অভিনতাদের স্থির চিত্র জুড়ে জুড়ে সেই গল্পগুলোও কমিকসের আকারে পরে বেরিয়েছে; সেগুলিও আমি পড়ে দেখেছি তবে তাতে প্রাণের ছোঁয়া পাইনি। যাই হোক, এই সমস্ত ডায়মন্ড কমিকসের প্রতি আমার ভালবাসার একটা উদাহরণ দিই।

তখন বোধহয় আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। তখন আমরা থাকতাম কসবায় একটা ভাঁড়া বাড়িতে। কসবা থেকে বিজন সেতু পেরলেই গড়িয়াহাট আর গড়িয়াহাটের মোড়ে, ঠিক 'আনন্দমেলা' দোকানটার সামনে, একটা অস্থায়ী কমিকসের বইয়ের দোকান ছিল। সেখান থেকে আমি কতো যে কমিকস কিনেছি তার ইয়ত্তা নেই। সেখান দিয়ে পেরোবার সময় আমি সব সময়ই (আর দাদা কখনো কখনো) কমিকস কিনে দেওয়ার জন্য বায়না ধরতাম। সব সময় তো আর বায়না পূরণ করা সম্ভব নয় (হয়তো উচিৎও নয়) তাই বাবা একবার কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না, এদিকে আমিও নাছোড়বান্দা। শেষপর্যন্ত বাবা বললেন যে উনি বই কিনে দিতে পারেন একটি শর্তে -- পরেরবার যখন সবাই মিলে ধোসা খেতে যাওয়া হবে তখন কিন্তু যাকে বই কিনে দেওয়া হবে সে কিছু খেতে পাবে না। সে সময় আমার আর দাদার কাছে ধোসা খাদ্যবস্তুটা ছিল অমৃতসমান। দাদা ধোসা খেতে রাজি হলেও আমি বললাম যে আমি কমিকসই কিনবো, তার জন্যে এক বেলা ভুখা থাকতেও আমি রাজি। অগত্যা বাবা আমাকে একটা চাচা চৌধুরীর কমিকস কিনে দিলেন। বাড়ি এসে আমি বইটা পড়া শেষ করে তারপর থেকে বইটা সর্বদা বগলদাবা করে ঘুরতাম। যদ্দূর সম্ভব, বইটা বালিশের তলায় রেখে ঘুমোতামও। ভাবছেন আমি বুঝি এতোই ভালবাসতাম কমিকসের বইগুলিকে? আরে না না, আমি বইটা হাতছাড়া করছিলাম না পাছে দাদা বইটা পড়ে ফেলে -- এই ভয়ে; দাদা বইটাও পড়বে আবার ধোসাও খেতে পাবে, এটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছিলাম না। বইটা পড়ার জন্য দাদার শত অনুনয় বিনয়েও যখন আমার মন গললো না তখন বাবাকেই মধ্যস্থতা করার জন্য আমাকেও ধোসা খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিতে হল। অবশেষে দাদাকে আমি বইটা পড়তে দিই।

পুনশ্চ: আচ্ছা, রাকা তো সেই চক্রম আচার্যের ওষুধ খেয়ে অমর হয়ে গেছিল। শেষ পর্যন্ত রাকার কি হাল হয়েছিল আপনারা জানেন কি? আমার তো জানতে ভীষণ কৌতূহল হচ্ছে।

Friday, August 8, 2014

আজ ২২শে শ্রাবণ, সেই উপলক্ষে একটা ছোট্ট গল্প।

কবিগুরুর কবিতার একটা অংশ পড়াচ্ছেন দাদাদের সেই বাংলার স্যার:
"সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি !"
আজ কেন এমনটা হলো তা বোঝাবার জন্যে স্যার এই কারণটা বলেছিলেন: "আজকালকার মায়েরা কি চায় জানিস? পাশের বাড়ির ছেলে হবে নেতাজি (সুভাষচন্দ্র বসু) আর আমার ছেলে নেতাজির উপর রচনা লিখে ফার্স্ট প্রাইজ পাবে।"

Wednesday, August 6, 2014

দু' দিন আগে বাংলা থেকে ইংরিজীতে অনুবাদ করা নিয়ে একটা বক্তব্য রেখেছিলাম। সেই পরিপ্রেক্ষিতে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল।
পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে দাদাদের ব্যাচকে বাংলার স্যার সাধু থেকে চলিত ভাষায় রূপান্তরিত করতে দিয়েছেন: "দ্যুমরাজ গর্জিলা কহিলেন ... ।"
এক ছাত্র এর উত্তরে লিখেছে: "দ্যুমরাজ গর্জিলার মতো গর্জন করে বললেন ... ।"

Monday, August 4, 2014

মিশন: পর্ব ১

এটা মিশনের স্কুলের ঘটনা। স্কুলটি সম্পূর্ণ আবাসিক হওয়ার দরুণ সমস্ত ছাত্রকে একসাথে থাকতে হয়। একদিন এক ছাত্রের কোনো কারণে দিনটি ভালো যাচ্ছিল না; সে স্নান করতে করতে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে: "ভগবান, তুমি একটা ****।" (গালাগালটা ঠিক কি ছিল, সেটা আর বিশদে লিখলাম না -- এই গল্পে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। পাঠকরা ইচ্ছে হলে নিজেদের পছন্দমতো কিছু একটা বসিয়ে নিতে পারেন।) দিনটা যে মন্দ থেকে মন্দতর দিকে মোড় নেবে সেটা এই ছাত্রের জানা ছিল না। স্নান করে বেরোতেই ঘনশ্যাম নামে এক ছাত্র তাকে কিল চড় মারতে শুরু করে দিল। নাদুসনুদুস চেহারার ঘনশ্যামকে সকলে শান্ত প্রকৃতির ছেলে বলেই জানতো, তার এহেন আচরণে সকলেই হতবাক। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এই আক্রমণ পূর্বের ছেলেটি কোনো ভাবে প্রতিরোধ পর্যন্ত করতে পারলো  না। পরে বন্ধুদের মধ্যে এই নিয়ে বিস্তর আলোচনা, কেন ঘনশ্যাম এভাবে রিআক্ট করলো। বেশির ভাগের মত যে ঘনশ্যাম নিশ্চয় ভীষণ ধার্মিক তাই ভগবানের অপমান সে মেনে নিতে পারেনি। ঘনশ্যাম এদিকে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছে। অনেক পরে অবশ্য আমরা তার এই আচরণের কারণ জানতে পেরেছিলাম -- ঘনশ্যামের বাবার নাম "ভগবান"।

Sunday, August 3, 2014

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের "লোটা কম্বল" বইটির প্রথম পৃষ্ঠা থেকে গৃহীত:
"স্কুলের প্রধান শিক্ষক মশাই ক্লাসে এসে ... শম্ভু সাঁতরার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলতেন, উঠে দাঁড়া। শম্ভু কলের পুতুলের মত উঠে দাঁড়াত। ইংরিজী কর, রামেরা দুই ভাই। শম্ভু বার কতক রাম নাম করে চেত্তা খাওয়া ঘুড়ির মত একপাশে কেতরে পড়ত। সেই বয়েসেই বুঝেছিলুম, ত্রেতায় রাম নামের যথেষ্ট পাওয়ার থাকলেও কলির শেষপাদে একেবারেই শক্তিহীন; কারণ এর পরেই হেডমাস্টার মশাই শম্ভুর পিঠে লিকলিকে বেত দিয়ে সপাসপ আঁচড় কাটতে শুরু করেছেন।"

স্কুলে থাকতে এই বই পড়ে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি, এখনও মাঝে মাঝে বইটার পাতা ওল্টাই। তবে তখন থেকেই একটা ব্যাপার মনের ভেতর খচখচ করতো -- সত্যিই তো, "রামেরা দুই ভাই" -- এর ইংরিজী অনুবাদটা ঠিক কি? ভাগ্যিস স্কুলে থাকতে কোনো টিচার আমাকে এই প্রশ্নটা করেনি, নইলে তো আমিও পারতাম না। পিএইচডি-তে ঢুকে অবশেষে মনে হচ্ছে কৃতকার্য হতে পেরেছি; "রামেরা দুই ভাই"-এর ইংরিজী অনুবাদ হল: "Ram et al. are two brothers."
কি, ঠিক লিখেছি তো?

Friday, August 1, 2014

কলেজে আমার এক সুদর্শন ব্যাচমেট ছিল। তার ছিল অভিনয়ের শখ। তাকে একবার আমি গিরীশ মঞ্চে অভিনয় করতেও দেখেছি। এই সব কাজে ব্যস্ত থাকার দরুণ সে মাঝে মাঝেই ক্লাস মিস করতো। একবার এক সাবজেক্টের viva চলছে, viva নিচ্ছেন আই.টি. ডিপার্টমেন্টের HoD -- তিনি আবার ভীষণ রাগি। স্বাভাবিক ভাবেই ক্লাসে অনুপস্থিতির ফলে আমার সেই বন্ধুটির প্রস্তুতি অতি সামান্য। তার উপর আবার কম উপস্থিতির হারের জন্যে তিরস্কার তো কপালে আছেই। যথা সময়ে তার পালা এলে পর সে সেই সাবজেক্টের বইটা হাতে নিয়েই স্যারের রুমে ঢুকে পড়লো। আমরা তো অবাক। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে তার মুখে হাসি দেখে তো আমাদের চোখ ছানাবড়া। তাকে সবাই মিলে ছেঁকে ধরায় সে যা বললো, সেই জবানীটা ছিল অনেকটা এই রকম:
"বুঝতেই পারছিস আমার প্রিপারেশন বলতে কিছুই ছিল না। তাই দুগ্গা বলে সাবজেক্টের বইটা হাতে নিয়েই স্যারের রুমে ঢুকে পড়লাম। ঢুকেই প্রথমে স্যারের সামনে কেঁদে ফেললাম। স্যারকে বললাম --
 "আমি খুব গরিব ঘরের ছেলে। বাবা বলে দিয়েছে আর আমার পড়ার খরচা জোগান দিনে পারবেন না। তাই রোজগারের চেষ্টায় একটা ব্যবসা শুরু করেছি -- রোজ তার পেছনেই অনেকটা সময় ব্যয় করতে হয়, ক্লাসেও তাই নিয়মিত আসতে পারিনা। আমি স্বীকার করছি যে আপনার সাবজেক্টটা আমি ভালো জানি না, তবে বিশ্বাস করুন স্যার, আমি এই বিষয়টা সত্যি সত্যি ভালো করে শিখতে চাই। সেই কারণে আমি বইটাও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি -- আপনি যদি দয়া করে ইম্পর্টান্ট চ্যাপ্টারগুলো দাগ দিয়ে দেন তাহলে আমার বড় উপকার হয়।"
স্যার তো পুরো গলে জল। বইয়ে দাগ দিলেন, সাথে এটাও বললেন যে উনি বোঝেন আমাকে কতো প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আমার মতো ছেলেরাই নাকি দেশের ভবিষ্যত। -- আশা করি ধরতেই পেরেছিস, আসলে সবটাই আমার অসাধারণ অভিনয়ের ফল।"
এই বলে আমার বন্ধুর মুখের হাসিটা আরো চওড়া হয়ে গেল।