লেখক: পর্ব ২৩
"কলমের জোর"
শুনেছি এককালে সরকারি আমলাদের একখানি সুপারিশ পত্রে যেমনি বেকার যুবকদের চাকরি জুটে যেতো তেমনি কলমের এক খোঁচায় অন্যের চাকরি গলাধঃকরণ করতেও তাঁদের বেগ পেতে হতো না। তবে আমি ঠিক এই ধরণের কলমের জোর নিয়ে লিখতে বসিনি কারণ এই ক্ষেত্রে লেখনী শৈলীর বিশেষ একটা ভূমিকা নেই, আমলার পদটির গুরুভার কতোখানি সেটাই নির্ণায়ক বিষয়। আমি এখন লিখতে বসেছি আমার নিজের লেখনী শক্তি কতোটা তার একটা হিসেব দিতে।
সৌভাগ্যবশতঃ পিএইচডিকালীন এবং তারপর চাকরিসূত্রে গবেষণা করার কিছু সুযোগ পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি। সেই সমস্ত কাজের ফলস্বরূপ কিছু রিসার্চ পেপারও বিভিন্ন জার্নাল এবং কনফারেন্সে ছাপা হয়েছে। রিসার্চ পেপার ছাপাতে গেলে যে খানিক সৃজনশীলতা লাগে সেটা বোধকরি সকলেরই কম বেশি ধারণা আছে। তবে এই সব পাবলিকেশনের পেছনে আর্টসের (অর্থাৎ লেখার ক্ষমতার) চেয়ে সায়েন্সের অবদান বেশি বলে আমি মনে করি। উপরন্তু এই সমস্ত কাজ করতে গিয়ে অন্যান্য অনেক কলিগের সাহায্য আমাকে নিতে হয়েছে, তাই এই সমস্ত কাজে আমার কৃতিত্ব ঠিক কতোটা সেটা নির্ধারণ করা সোজা ব্যাপার নয়। তাই চলে আসি আমার "সাহিত্য চর্চার" বিষয়ে।
ফেসবুকে পাঠককুলের স্তুতিবাক্য শুনে বাড় খেয়ে এককালে কয়েকটা গল্প পাঠিয়েছিলাম কিছু পত্র-পত্রিকায়। বলাই বাহুল্য, সেই সব গল্প আজও দিনের আলো দেখেনি। এমনকি কোনো পত্রিকা থেকে "আপনার লেখা পেয়েছি" এজাতীয় কোনো সামান্য উত্তর পর্যন্ত পাইনি। অনেকদিন আগে ভারতের একটি নামজাদা পত্রিকায় কর্মরত এক বন্ধুকে এই ব্যাপারটা বলেছিলাম। সে জানায় যে আমার মতো লেখকদের লেখা নাকি দিনে প্রায় একশোখানি করে জমা পরে তাদের দপ্তরে। "তাহলে উপায় কি?" জিজ্ঞাসা করায় সেই বন্ধু উত্তর দেয় যে লেখা ছাপাতে হলে প্রথমে সুনাম অর্জন করতে হবে। "সুনাম অর্জন করার উপায় কি?" এই প্রশ্নের সে সরল উত্তর দেয় -- কেন, লেখা ছাপিয়ে!
বন্ধুর পরামর্শ আমি ফেলে দেইনি। গতবছর দু'খানা নতুন লেখা জমা দিই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দুটি ওয়েব ম্যাগাজিনে। আমার ধারণা ছিলো এই সব অনলাইন ম্যাগাজিনে লেখা ছাপানোটা বোধহয় সহজ ব্যাপার হবে। এই ম্যাগাজিনগুলির এডিটরদেরকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড হিসেবে অ্যাডও করে নিই। মনে মনে ভাবি এবার আমার লেখা আটকায় কে? কিন্তু, হা হতোস্মি, এখানেও আমার কোনো লেখা মনোনীত হয় না। তবে মন্দের ভালো, সৌজন্যতাবশতঃ দুঃখের খবরটা এডিটররা নিজেরা মেইল করে জানিয়েছেন। হতাশ হয়ে আমি ভাবতে বসি সত্যিই কি আমার লেখনী শক্তি নেই?
অবশেষে একটা ঘটনা মনে পড়ায় খানিক স্বস্তি ফিরে পাই। আমি একবার দিল্লিতে একটা কনফারেন্সে বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড পাই। অ্যাওয়ার্ড হিসেবে সার্টিফিকেটের সাথে ছিলো ফ্লিপকার্টের চল্লিশ হাজার টাকার গিফ্ট কুপন। আমার তখন নিজস্ব ল্যাপটপ ছিলো না তাই ঠিক করি এই টাকায় একটা ল্যাপটপ কিনবো। কিন্তু পরে আবিষ্কার করি আমাকে কনফারেন্সের উদ্যোক্তারা আসলে দিয়েছেন পাঁচশো টাকা করে মোট আশিটি গিফট কুপন। মোট অঙ্কটা ৪০ হাজার হলেও মুশকিলের ব্যাপার হলো ফ্লিপকার্ট থেকে কোনো আইটেম কিনতে গেলে একসাথে তিনটের বেশি কুপন অ্যাপ্লাই করা যায় না। তার মানে দেড় হাজার টাকার অনেকগুলো আইটেম কিনতে হবে আমাকে পুরো ৪০ হাজার খরচ করতে গেলে। এতো জিনিস আমি কি কিনবো? আমি তখন ফ্লিপকার্টের কাস্টমার কেয়ারের দ্বারস্থ হই। কিন্তু তারা আমাকে কোনো রকম সাহায্য করে না। আমি শেষমেশ মরিয়া হয়ে ফ্লিপকার্টের দুই মালিক -- বিন্নী বানসাল আর শচীন বানসাল -- কে মেইল করি। আমার মেইলের বক্তব্য খানিক এরকম ছিলো: "আমি একজন দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্র। একটা ল্যাপটপ পেলে আমার গবেষণা করতে বিশেষ সুবিধা হয়। ... আপনারা আইআইটির প্রাক্তন ছাত্র, এই জুনিয়রের মিনতি দয়া করে শুনুন। ... ইত্যাদি।"
কিছুদিন পরে আমার কাছে ফ্লিপকার্টের কাস্টমার কেয়ার থেকে ফোন আসে এবং তারা জানায় যে গিফ্ট কুপনের কোডগুলো ওদের সাথে শেয়ার করলে ওরা আমার ফ্লিপকার্ট ওয়ালেটে চল্লিশ হাজার টাকা যোগ করে দেবে। আমি তাদেরকে বলি ফ্লিপকার্ট ওয়ালেটে ম্যাক্সিমাম দশ হাজার টাকা অবধি রাখা যায় বলে ওয়েবসাইটে লেখা আছে। এর উত্তরে ওরা বলে যে শুধুমাত্র আমার ইউসার আইডির জন্যে ওরা এই লিমিটটা বাড়িয়ে চল্লিশ হাজার করে দিয়েছে। আমি ওদের নির্দেশ অনুযায়ী কুপনের কোডগুলি শেয়ার করি আর তার কয়েকদিন পর পছন্দমতো একটা ল্যাপটপ কিনি। সেই ল্যাপটপেই এখন আমি এই লেখাটা লিখছি।
এই লেখার উপসংহার এখনো খানিক বাকি আছে। আইআইটি খড়্গপুরে পড়াকালীন আমার এক ল্যাবমেটের একটি পেপার ইটালির এক কন্ফারেন্সে মনোনীত হয়। কন্ফারেন্সের রেজিস্ট্রেশন ফী, যাতায়াতের খরচ, হোটেল ভাড়া, খাওয়াদাওয়া, ইত্যাদি নিয়ে মোট খরচ প্রচুর। এদিকে তার ফান্ডিং সামান্য। তাকে আমি আমার সেই ইমেইলটা ফরওয়ার্ড করি। আমার ল্যাবমেট তাতে সামান্য পরিবর্তন করে পাঠায় ইটালিতে অনুষ্ঠিত কন্ফারেন্সের উদ্যোক্তাদের কাছে। সেই মেইল পড়ে তারা ল্যাবমেটের রেজিস্ট্রেশন ফী মকুব করে দেয়, উপরন্তু ইটালিতে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেয়।
(দয়া করিয়া ইমেইলটি আমার নিকট চাইবেন না। অধিক ব্যাবহারে ইহার কার্যকারিতা কমিয়া যাইতে পারে। কে বলিতে পারে আবার কবে ইহার প্রয়োজন পড়িবে!)
"কলমের জোর"
শুনেছি এককালে সরকারি আমলাদের একখানি সুপারিশ পত্রে যেমনি বেকার যুবকদের চাকরি জুটে যেতো তেমনি কলমের এক খোঁচায় অন্যের চাকরি গলাধঃকরণ করতেও তাঁদের বেগ পেতে হতো না। তবে আমি ঠিক এই ধরণের কলমের জোর নিয়ে লিখতে বসিনি কারণ এই ক্ষেত্রে লেখনী শৈলীর বিশেষ একটা ভূমিকা নেই, আমলার পদটির গুরুভার কতোখানি সেটাই নির্ণায়ক বিষয়। আমি এখন লিখতে বসেছি আমার নিজের লেখনী শক্তি কতোটা তার একটা হিসেব দিতে।
সৌভাগ্যবশতঃ পিএইচডিকালীন এবং তারপর চাকরিসূত্রে গবেষণা করার কিছু সুযোগ পেয়েছি এবং এখনো পাচ্ছি। সেই সমস্ত কাজের ফলস্বরূপ কিছু রিসার্চ পেপারও বিভিন্ন জার্নাল এবং কনফারেন্সে ছাপা হয়েছে। রিসার্চ পেপার ছাপাতে গেলে যে খানিক সৃজনশীলতা লাগে সেটা বোধকরি সকলেরই কম বেশি ধারণা আছে। তবে এই সব পাবলিকেশনের পেছনে আর্টসের (অর্থাৎ লেখার ক্ষমতার) চেয়ে সায়েন্সের অবদান বেশি বলে আমি মনে করি। উপরন্তু এই সমস্ত কাজ করতে গিয়ে অন্যান্য অনেক কলিগের সাহায্য আমাকে নিতে হয়েছে, তাই এই সমস্ত কাজে আমার কৃতিত্ব ঠিক কতোটা সেটা নির্ধারণ করা সোজা ব্যাপার নয়। তাই চলে আসি আমার "সাহিত্য চর্চার" বিষয়ে।
ফেসবুকে পাঠককুলের স্তুতিবাক্য শুনে বাড় খেয়ে এককালে কয়েকটা গল্প পাঠিয়েছিলাম কিছু পত্র-পত্রিকায়। বলাই বাহুল্য, সেই সব গল্প আজও দিনের আলো দেখেনি। এমনকি কোনো পত্রিকা থেকে "আপনার লেখা পেয়েছি" এজাতীয় কোনো সামান্য উত্তর পর্যন্ত পাইনি। অনেকদিন আগে ভারতের একটি নামজাদা পত্রিকায় কর্মরত এক বন্ধুকে এই ব্যাপারটা বলেছিলাম। সে জানায় যে আমার মতো লেখকদের লেখা নাকি দিনে প্রায় একশোখানি করে জমা পরে তাদের দপ্তরে। "তাহলে উপায় কি?" জিজ্ঞাসা করায় সেই বন্ধু উত্তর দেয় যে লেখা ছাপাতে হলে প্রথমে সুনাম অর্জন করতে হবে। "সুনাম অর্জন করার উপায় কি?" এই প্রশ্নের সে সরল উত্তর দেয় -- কেন, লেখা ছাপিয়ে!
বন্ধুর পরামর্শ আমি ফেলে দেইনি। গতবছর দু'খানা নতুন লেখা জমা দিই বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দুটি ওয়েব ম্যাগাজিনে। আমার ধারণা ছিলো এই সব অনলাইন ম্যাগাজিনে লেখা ছাপানোটা বোধহয় সহজ ব্যাপার হবে। এই ম্যাগাজিনগুলির এডিটরদেরকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড হিসেবে অ্যাডও করে নিই। মনে মনে ভাবি এবার আমার লেখা আটকায় কে? কিন্তু, হা হতোস্মি, এখানেও আমার কোনো লেখা মনোনীত হয় না। তবে মন্দের ভালো, সৌজন্যতাবশতঃ দুঃখের খবরটা এডিটররা নিজেরা মেইল করে জানিয়েছেন। হতাশ হয়ে আমি ভাবতে বসি সত্যিই কি আমার লেখনী শক্তি নেই?
অবশেষে একটা ঘটনা মনে পড়ায় খানিক স্বস্তি ফিরে পাই। আমি একবার দিল্লিতে একটা কনফারেন্সে বেস্ট পেপার অ্যাওয়ার্ড পাই। অ্যাওয়ার্ড হিসেবে সার্টিফিকেটের সাথে ছিলো ফ্লিপকার্টের চল্লিশ হাজার টাকার গিফ্ট কুপন। আমার তখন নিজস্ব ল্যাপটপ ছিলো না তাই ঠিক করি এই টাকায় একটা ল্যাপটপ কিনবো। কিন্তু পরে আবিষ্কার করি আমাকে কনফারেন্সের উদ্যোক্তারা আসলে দিয়েছেন পাঁচশো টাকা করে মোট আশিটি গিফট কুপন। মোট অঙ্কটা ৪০ হাজার হলেও মুশকিলের ব্যাপার হলো ফ্লিপকার্ট থেকে কোনো আইটেম কিনতে গেলে একসাথে তিনটের বেশি কুপন অ্যাপ্লাই করা যায় না। তার মানে দেড় হাজার টাকার অনেকগুলো আইটেম কিনতে হবে আমাকে পুরো ৪০ হাজার খরচ করতে গেলে। এতো জিনিস আমি কি কিনবো? আমি তখন ফ্লিপকার্টের কাস্টমার কেয়ারের দ্বারস্থ হই। কিন্তু তারা আমাকে কোনো রকম সাহায্য করে না। আমি শেষমেশ মরিয়া হয়ে ফ্লিপকার্টের দুই মালিক -- বিন্নী বানসাল আর শচীন বানসাল -- কে মেইল করি। আমার মেইলের বক্তব্য খানিক এরকম ছিলো: "আমি একজন দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্র। একটা ল্যাপটপ পেলে আমার গবেষণা করতে বিশেষ সুবিধা হয়। ... আপনারা আইআইটির প্রাক্তন ছাত্র, এই জুনিয়রের মিনতি দয়া করে শুনুন। ... ইত্যাদি।"
কিছুদিন পরে আমার কাছে ফ্লিপকার্টের কাস্টমার কেয়ার থেকে ফোন আসে এবং তারা জানায় যে গিফ্ট কুপনের কোডগুলো ওদের সাথে শেয়ার করলে ওরা আমার ফ্লিপকার্ট ওয়ালেটে চল্লিশ হাজার টাকা যোগ করে দেবে। আমি তাদেরকে বলি ফ্লিপকার্ট ওয়ালেটে ম্যাক্সিমাম দশ হাজার টাকা অবধি রাখা যায় বলে ওয়েবসাইটে লেখা আছে। এর উত্তরে ওরা বলে যে শুধুমাত্র আমার ইউসার আইডির জন্যে ওরা এই লিমিটটা বাড়িয়ে চল্লিশ হাজার করে দিয়েছে। আমি ওদের নির্দেশ অনুযায়ী কুপনের কোডগুলি শেয়ার করি আর তার কয়েকদিন পর পছন্দমতো একটা ল্যাপটপ কিনি। সেই ল্যাপটপেই এখন আমি এই লেখাটা লিখছি।
এই লেখার উপসংহার এখনো খানিক বাকি আছে। আইআইটি খড়্গপুরে পড়াকালীন আমার এক ল্যাবমেটের একটি পেপার ইটালির এক কন্ফারেন্সে মনোনীত হয়। কন্ফারেন্সের রেজিস্ট্রেশন ফী, যাতায়াতের খরচ, হোটেল ভাড়া, খাওয়াদাওয়া, ইত্যাদি নিয়ে মোট খরচ প্রচুর। এদিকে তার ফান্ডিং সামান্য। তাকে আমি আমার সেই ইমেইলটা ফরওয়ার্ড করি। আমার ল্যাবমেট তাতে সামান্য পরিবর্তন করে পাঠায় ইটালিতে অনুষ্ঠিত কন্ফারেন্সের উদ্যোক্তাদের কাছে। সেই মেইল পড়ে তারা ল্যাবমেটের রেজিস্ট্রেশন ফী মকুব করে দেয়, উপরন্তু ইটালিতে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেয়।
(দয়া করিয়া ইমেইলটি আমার নিকট চাইবেন না। অধিক ব্যাবহারে ইহার কার্যকারিতা কমিয়া যাইতে পারে। কে বলিতে পারে আবার কবে ইহার প্রয়োজন পড়িবে!)
No comments:
Post a Comment