Friday, November 7, 2014

ছোটবেলায় মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরনোর সময়টা ছিল আমার কাছে অত্যন্ত ভীতিপ্রদ। রেজাল্ট বেরনোর হপ্তাখানেকের মধ্যেই বাংলা দূরদর্শনে এই পরীক্ষাগুলির কৃতি ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে প্রশ্নোত্তরভিত্তিক একটি অনুষ্ঠান হতো, এবং মায়ের সাথে বসে এই অনুষ্ঠানটি দেখা আমার কাছে ছিল একপ্রকার বাধ্যতামূলক। প্রত্যেক বছর ছাত্র ছাত্রীকে কিছু বাঁধাধরা প্রশ্ন করতেন অনুষ্ঠান সঞ্চালকরা যেমন -- দিনে কতো ঘন্টা পড়তে, কতোগুলো সাবজেক্টের জন্যে প্রাইভেট টিউশন নিতে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কি, ইত্যাদি। ছাত্র ছাত্রীদের উত্তরগুলোও ছিল এক গতের -- দিনে ষোলো থেকে সতেরো ঘন্টা পড়ি, অঙ্ক পদার্থবিদ্যা ইতিহাস ভূগোল বাংলা ইংলিশ (এককথায় সব সাবজেক্টের) টিউশন নিতাম, ডাক্তার হয়ে বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বা শিক্ষক হয়ে দেশের মুখ উজ্জ্বল করাই আমার জীবনের ব্রত, ইত্যাদি। তবে মুশকিল হতো যখন এই সব ছাত্র  ছাত্রীদের সাক্ষাৎকার দেখে মা বলতো: "দেখেছিস, দাদা দিদিরা সব কতো পড়াশুনা করে, এমনি এমনি তো আর ভালো ফল হয় না।" তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করতো: "তোর যে কি হবে ?"

আমার অবশ্য এই সব দিনে 'ষোলো থেকে সতেরো ঘন্টা' পড়াশুনা করা দাদা দিদিদের দেখে মনে হতো -- এরা মানুষ না রোবোট বোঝা দায়। শুধুমাত্র ভালবাসার তাগিদেই এরা এতো পড়াশুনা করে নাকি অন্য কোনো কারণে ? আমার পরিচিত এক মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করা ছেলের সম্বন্ধে শুনেছিলাম সে নাকি প্রাথমিক স্কুলে পড়াকালীন পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছিলো বলে তার বাবা তাকে রাস্তায় জুতোপেটা করেছিলো। (জুতোপেটা করাটা যদি অতিরঞ্জন বলে আপনার মনে হয়ে থাকে, তাহলে নিজের পক্ষসমর্থন করে বলে রাখি এই অতিরঞ্জনের উৎস আমি নই -- যার কাছ থেকে আমি ঘটনাটি শুনেছি, দায়ী সেই ব্যক্তি।) অর্থাৎ খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে ভালো নম্বরের পেছনে পড়াশুনার প্রতি ভালবাসার সাথে ব্যর্থতার ভয়ও সমধিক ভাবে দায়ী।

এই প্রসঙ্গে অর্ণব রায়ের একটা বক্তৃতার কিছু অংশ মনে পড়ে গেলো। অর্ণব রায় কে? অর্ণব রায় একজন বিখ্যাত Blogger। ওনার ব্লগ "Random Thoughts of a Demented Mind" ২০০৬ ও ২০০৮ সালে Indiblog of the Year অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলো। মানে ওনার ব্লগ বহু লোকে নিয়মিত পড়ে থাকেন আর কি (আমার ব্লগের ক্ষেত্রে যে কথা প্রযোজ্য নয়)। উনি TEDX-এর অন্তর্গত একটি বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন আইআইটিতে -- সেখানেই শোনা। তারিখটা ছিলো ০৬-০২-২০১। (সেদিন আবার আইআইটিতে একটি বুনো হাতিও ঢুকে পড়েছিলো, তবে সে কথা আপাতত থাক।)
অর্ণব রায় নাকি ছোটোবেলায় একবার বাবার কাছে গিয়ে বলেছিলেন যে উনি বড় হয়ে গাইয়ে হবেন -- শুনে বাবা বলেন, ঠিক আছে। কিছু দিন পর অর্ণব আবার বাবার কাছে গিয়ে বলেন উনি বড় হয়ে Break Dancer হবেন -- শুনে বাবা এবারও বলেন, ঠিক আছে। আরেকটু বড় হবার পর বাবা অর্ণবকে কাছে ডেকে উপদেশ দেন, গাইয়ে বা নাচিয়ে হয়ে বাঁচতে গেলে একজনকে সেই পেশায় শ্রেষ্ঠ হতে হয় কিন্তু একজন ইঞ্জিনিয়ার হলে সে সাধারণ মানের হলেও তার চলে যায়। এই অকাট্য যুক্তি শুনে অর্ণব বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হয় -- ওনার কথা শুনে আমারও মনে হয় যে আমিও সঠিক পেশাই বেছে নিয়েছি।

শেষ করবো একটা মজার ঘটনা দিয়ে যেখানে একটি প্রতিযোগিতায় প্রথমকে মনে না রেখে দর্শকরা অন্তিম স্থানাধিকারীকেই ভালোবেশে ফেলেছিলেন। ঘটনাটি ঘটিয়েছিলো আমার মামাতো দাদা। একদম নিচু ক্লাসের দৌড় প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। নাদুসনুদুস হওয়ার দরুণ আমার মামাতো দাদা একটু পরেই বাকিদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারানোর উদ্দেশ্যে সে দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে কাল্পনিক তীর ছুঁড়তে থাকে বাকি প্রতিযোগীদের দিকে তাক করে। এই দেখে তো সমস্ত দর্শক হেসে কুটোপাটি। আমার দাদাও ততক্ষনে মনে মনে শত্রুদের বধ করে বিজয়ীর হাসি হাসছে।

No comments: