Monday, November 2, 2015

লেখক: পর্ব ৭

হাতে গরম পাতে গরম ঘটনা। অর্থাৎ ঘটনাটা আজকেই ঘটেছে। বাবা মা বেঙ্গালুরু আসবে বলে ইন্ডেন গ্যাসের অফিসে গেছি। গিয়ে দেখি দোকানের কিছু কর্মচারী আসে পাশে ঘোরাঘুরি করলেও অফিস বন্ধ। কর্মচারীদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম অফিস কখন খুলবে। সে জানালো বড়বাবুর আসার সময় হয়ে গেছে, এক্ষুনি চলে আসবেন আর উনি আসলেই অফিস খোলা হবে। ঘড়িতে দেখি তখন এগারোটা কুড়ি বাজছে, অফিস খোলার সময় দেওয়ালে লেখা আছে এগারোটা। কি আর করি, অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। অ্যাদ্দূর যখন এসেছি তখন গ্যাস কানেকশনটা খড়্গপুর থেকে বেঙ্গালুরুতে ট্রান্সফার করে তবেই যাব।

খড়্গপুরে গ্যাস কানেকশন নেওয়ার পেছনে কিছু কারণ আছে। আইআইটি খড়্গপুরে ঢুকে প্রথমে আমার বাস ছিল VSRC নামক এক হোস্টেলে। এই হোস্টেলটি কর্মকর্তারা বানিয়েছিলেন বিবাহিত স্টুডেন্টদের জন্যে। পরে ছাত্রসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই হোস্টেলটি ব্যাচেলর স্টুডেন্টদের বাসভূমি হয়ে ওঠে। আইআইটির অন্যান্য হোস্টেলগুলির মতো এই হোস্টেলটির সর্বজনীন ক্যান্টিনের পরিকাঠামো না থাকায় এই হোস্টেলের কিছু কিছু ছাত্রেরা দল বানিয়ে আলাদা আলাদা মেস করে খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আমি ঢুকেছিলাম অমিতদার মেসে। এই মেসে থাকাকালীন জনগণের সুবিধার্থে গ্যাস কানেকশান নিয়েছিলাম নানা লোকের প্ররোচনায়। পরে আইআইটিতে অন্য হোস্টেলে বদলি হয়ে যাবার পরও আড়াই বছর ধরে আমার নামের গ্যাস কানেকশনেই অমিতদার মেসে রান্না হত। সেই নিয়ে অবশ্য আমার কোনো দুঃখ নেই, পুরনো মেসে কোনো উপলক্ষে ভালো খাওয়াদাওয়া থাকলেই আমার নেমন্তন্ন একরকম পাকা ছিল। আর আইআইটিতে পড়াকালীন উপলক্ষের অভাবও তেমন ছিল না। কনফারেন্স বা জার্নালে পেপার অ্যাকসেপ্ট হলে সেলিব্রেশন তো আছেই সাথে আরো কতোরকমের হুজুগ। একবার মনে আছে মেসের এক ছাত্র খুব নামকরা এক কনফারেন্সে পেপার পাঠিয়েছে, পেপার অ্যাকসেপ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এমন সময় সেই ছাত্রকে সবাই মালে ধরা হলো বাকিদের খাওয়ানোর জন্য -- কারণ? ওই ছাত্রের মতো ওরকম কঠিন কনফারেন্সে পেপার পাঠানোর সাহস আর ক'জনই বা দেখিয়েছে? ছাত্রটির বুকের পাটা আছে একথা তো সকলেই একবাক্যে স্বীকার করবে। ছাত্র তো যে সে সাধারণ ছেলে নয়, পুরো বাঘ বাচ্চা ! এরকম কতো কিছু বলে বাড় খাইয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রিট আদায় করেছিলাম।

যাই হোক মূল ঘটনায় ফেরা যাক। আশায় আশায় দাঁড়িয়ে আছি, বড়বাবু বুঝি এই এলেন। অবশেষে সাড়ে বারোটার সময় বড়বাবু এলেন। অফিস খোলা হলো। আমি কেন এসেছি জিজ্ঞেস করায় ওনাকে জানালাম আমার গ্যাস কানেকশন ট্রান্সফারের ব্যাপারটা।
-- আগের ডিলারের কাছ থেকে ট্রান্সফারের কাগজ নিয়ে এসেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- অ্যাড্রেস প্রুফ এনেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- আইডি প্রুফ এনেছেন?
-- হ্যাঁ, স্যার।
-- একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি?
-- হ্যাঁ, স্যার। এই যে।
বড়বাবু কিছুক্ষণ আমার কাগজপত্র মন দিয়ে দেখলেন। কাগজে কোনো খুঁত খুঁজে না পেয়ে বললেন
-- আপনি তো দেখছি সমস্ত প্রিপারেশন নিয়েই এসেছেন।
এই শুনে তো আমি খুব খুশি। আন্দাজ করে সমস্ত কাগজ একবারে ঠিকঠাক নিয়ে এসেছি। পারলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিই। এক ঘন্টার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে -- সে সব যাকগে, সরকারী অফিসে এসে কোনো অসুবিধে ছাড়াই নির্বিঘ্নে কাজ হয়ে গেছে -- একথা কে কবে শুনেছে?
এরপর বড়বাবু আমার দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন:
-- এই নিন, এই কাগজে আমাদের মেন অফিসের ঠিকানা লেখা আছে। সেখানে গিয়ে আপনার কাগজপত্র দেখান, আপনার গ্যাস কানেকশন ট্রান্সফার হয়ে যাবে। হয়ে গেলে এখানে গ্যাসের বইটা নিয়ে চলে আসবেন, আমরা গ্যাস সিলিন্ডার আপনার ঘরে পাঠিয়ে দেব। এই অফিসটা তো শুধুমাত্র আউটলেটের জন্য, গ্যাস ট্রান্সফার ইত্যাদি সব আমাদের মেন অফিসেই হয়।
-- যাচ্চলে !!!

No comments: