লেখক: পর্ব ৮
আগেই লিখেছি বাবার বদলির চাকরি হওয়ার দরুণ ছেলেবেলায় ICSE, CBSE এবং West Bengal এই তিনটে বোর্ডেই পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। বরাবর ইংলিশ আমার ফার্স্ট ল্যাঙগোয়েজ ছিল আর বাংলা সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ। মাঝখানে শুধু হাসিমারায় এয়ার ফোর্স স্কুলে পড়ার সময় হিন্দি আমার সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ ছিল কারণ সেই স্কুলে বাংলা পড়ানো হতো না। তবুও আমি বাংলায় গল্প লিখতে যতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি ইংলিশে ততটা নয়। সম্প্রতি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের "ইতি পলাশ" বইটা পড়ে জানলাম কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে গেলে সেই ভাষায় শুধু লিখলে পড়লে হবে না, সেই ভাষায় স্বপ্ন দেখাটাও অভ্যেস করতে হবে। চিরকাল বাংলায় স্বপ্ন দেখে আসার ফলেই হয়তো ইংরেজি ভাষার সঙ্গে সেভাবে আত্মীয়তা গড়ে উঠলো না। তবে ইংরেজি ভাষায় গল্প লিখতে না পারা নিয়ে আমার ক্ষোভ নেই বিশেষ করে এই গল্পটার ক্ষেত্রে কেননা আমার ধারণা একমাত্র বাঙালিরাই এই গল্পের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম।
নতুন অফিসে ঢুকে আমি ঠিক করেছিলাম যে সেখানকার ক্যান্টিনের সমস্ত খাবার আমি চেখে দেখব। এই ভেবে শুরুতে আমি প্রত্যেকদিন আলাদা আলাদা ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ নিতাম। আমার এই অভ্যাসের কথা শুনে একদিন এক সহকর্মী সেদিন লাঞ্চে আমাকে কর্ণাটকের বিশেষ খাবার "রাগি মুদ্দে" চেখে দেখার পরামর্শ দিল। রাগি মুদ্দে খাদ্যটি কালো রঙের, গড়নটি গোলগাল অনেকটা ক্রিকেট বলের মতো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় আপেলের মতো কামড়ে খেতে হয়। আমাকে সেই সহকর্মী জানায় কন্নড়রা রুটির বদলে রাগি মুদ্দে খায় সম্বরে ভিজিয়ে। একটুখানি রাগি মুদ্দে ছিঁড়ে সম্বর ডালে ডুবিয়ে মুখে দিয়েছি। দেখি খাবারটা কেমন চ্যাটচ্যাটে যেন কাদা খাচ্ছি। চিবিয়ে চলেছি তো চলেছিই। স্বাদটাও বিস্বাদ। খানিক বাদে সেই সহকর্মী আবার জানায় যে রাগি মুদ্দে মুখে দিয়ে গিলে নেওয়াটাই নাকি দস্তুর, খাবারটাকে চিবোতে নেই। উপদেশ কার্যে পরিণত করতে গিয়ে দেখি বেশ ভয় করছে, রাগি মুদ্দে গিলতে গেলে মনে হচ্ছে খাদ্যনালীটা এই বুঝি আটকে যাবে। অতএব সেদিন লাঞ্চে কার্যত উপোস করেই থাকতে হবে বুঝতে পারলাম।
এক্ষণে আমাদের অফিসের ক্যান্টিনের একটা বৈশিষ্ট বলে রাখি। এখানে প্রত্যেকদিন আগেরদিন কর্মীরা কতোখানি খাবার নষ্ট করেছে আর তা দিয়ে কতোজন মানুষের উদরপূর্তি করা সম্ভব তার একটা হিসেব লেখা থাকে। যেমন ধরুন: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ১০০জন মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" এই লেখার উদ্দেশ্য যাতে লোকে খাবার নষ্ট না করে। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাধু পরিকল্পনা।
কিন্তু সেদিন রাগি মুদ্দের জন্য আমাকে উপবাস করে থাকতে হবে বলে আমার মনমেজাজ বিগড়ে গেছে। আমি সেই সহকর্মীকে জানাই যে পরেরদিন অফিসের ক্যান্টিনে এরকম একটা লেখা লিখে রাখা উচিৎ: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ৯০জন মানুষের আর ১০জন কন্নড়ের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" কারণ সেদিনের নষ্ট হওয়া সমস্ত রাগি মুদ্দে যে কোনো মানুষের খিদে মেটাতে পারবে না, রাগি মুদ্দের সদ্ব্যবহার কন্নড়দের দ্বারাই সম্ভব, বাঙালিদের দ্বারা তো কোনো মতেই নয়।
পরিশেষে: আমার এই "রেসিস্ট" মন্তব্যের শাস্তিস্বরূপ সেদিন বিকেলে চায়ের সময় আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকের জন্য বিস্কুটের যোগান আমাকে দিতে হয়েছিল। আমি নিজেই একটা পুরো প্যাকেট সাবড়ে দিয়েছিলাম, দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি কিনা।
আগেই লিখেছি বাবার বদলির চাকরি হওয়ার দরুণ ছেলেবেলায় ICSE, CBSE এবং West Bengal এই তিনটে বোর্ডেই পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। বরাবর ইংলিশ আমার ফার্স্ট ল্যাঙগোয়েজ ছিল আর বাংলা সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ। মাঝখানে শুধু হাসিমারায় এয়ার ফোর্স স্কুলে পড়ার সময় হিন্দি আমার সেকেন্ড ল্যাঙগোয়েজ ছিল কারণ সেই স্কুলে বাংলা পড়ানো হতো না। তবুও আমি বাংলায় গল্প লিখতে যতটা স্বচ্ছন্দ বোধ করি ইংলিশে ততটা নয়। সম্প্রতি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের "ইতি পলাশ" বইটা পড়ে জানলাম কোনো ভাষা আয়ত্ত করতে গেলে সেই ভাষায় শুধু লিখলে পড়লে হবে না, সেই ভাষায় স্বপ্ন দেখাটাও অভ্যেস করতে হবে। চিরকাল বাংলায় স্বপ্ন দেখে আসার ফলেই হয়তো ইংরেজি ভাষার সঙ্গে সেভাবে আত্মীয়তা গড়ে উঠলো না। তবে ইংরেজি ভাষায় গল্প লিখতে না পারা নিয়ে আমার ক্ষোভ নেই বিশেষ করে এই গল্পটার ক্ষেত্রে কেননা আমার ধারণা একমাত্র বাঙালিরাই এই গল্পের প্রকৃত স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম।
নতুন অফিসে ঢুকে আমি ঠিক করেছিলাম যে সেখানকার ক্যান্টিনের সমস্ত খাবার আমি চেখে দেখব। এই ভেবে শুরুতে আমি প্রত্যেকদিন আলাদা আলাদা ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ নিতাম। আমার এই অভ্যাসের কথা শুনে একদিন এক সহকর্মী সেদিন লাঞ্চে আমাকে কর্ণাটকের বিশেষ খাবার "রাগি মুদ্দে" চেখে দেখার পরামর্শ দিল। রাগি মুদ্দে খাদ্যটি কালো রঙের, গড়নটি গোলগাল অনেকটা ক্রিকেট বলের মতো। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় আপেলের মতো কামড়ে খেতে হয়। আমাকে সেই সহকর্মী জানায় কন্নড়রা রুটির বদলে রাগি মুদ্দে খায় সম্বরে ভিজিয়ে। একটুখানি রাগি মুদ্দে ছিঁড়ে সম্বর ডালে ডুবিয়ে মুখে দিয়েছি। দেখি খাবারটা কেমন চ্যাটচ্যাটে যেন কাদা খাচ্ছি। চিবিয়ে চলেছি তো চলেছিই। স্বাদটাও বিস্বাদ। খানিক বাদে সেই সহকর্মী আবার জানায় যে রাগি মুদ্দে মুখে দিয়ে গিলে নেওয়াটাই নাকি দস্তুর, খাবারটাকে চিবোতে নেই। উপদেশ কার্যে পরিণত করতে গিয়ে দেখি বেশ ভয় করছে, রাগি মুদ্দে গিলতে গেলে মনে হচ্ছে খাদ্যনালীটা এই বুঝি আটকে যাবে। অতএব সেদিন লাঞ্চে কার্যত উপোস করেই থাকতে হবে বুঝতে পারলাম।
এক্ষণে আমাদের অফিসের ক্যান্টিনের একটা বৈশিষ্ট বলে রাখি। এখানে প্রত্যেকদিন আগেরদিন কর্মীরা কতোখানি খাবার নষ্ট করেছে আর তা দিয়ে কতোজন মানুষের উদরপূর্তি করা সম্ভব তার একটা হিসেব লেখা থাকে। যেমন ধরুন: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ১০০জন মানুষের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" এই লেখার উদ্দেশ্য যাতে লোকে খাবার নষ্ট না করে। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাধু পরিকল্পনা।
কিন্তু সেদিন রাগি মুদ্দের জন্য আমাকে উপবাস করে থাকতে হবে বলে আমার মনমেজাজ বিগড়ে গেছে। আমি সেই সহকর্মীকে জানাই যে পরেরদিন অফিসের ক্যান্টিনে এরকম একটা লেখা লিখে রাখা উচিৎ: "গতকাল আমরা ২৫ কিলো খাবার নষ্ট করেছি যা ৯০জন মানুষের আর ১০জন কন্নড়ের ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারতো।" কারণ সেদিনের নষ্ট হওয়া সমস্ত রাগি মুদ্দে যে কোনো মানুষের খিদে মেটাতে পারবে না, রাগি মুদ্দের সদ্ব্যবহার কন্নড়দের দ্বারাই সম্ভব, বাঙালিদের দ্বারা তো কোনো মতেই নয়।
পরিশেষে: আমার এই "রেসিস্ট" মন্তব্যের শাস্তিস্বরূপ সেদিন বিকেলে চায়ের সময় আমাদের গ্রুপের প্রত্যেকের জন্য বিস্কুটের যোগান আমাকে দিতে হয়েছিল। আমি নিজেই একটা পুরো প্যাকেট সাবড়ে দিয়েছিলাম, দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি কিনা।
No comments:
Post a Comment