Saturday, September 20, 2014

"খোকা, তুমি বড় হয়ে কি হবে?" -- এ সব প্রশ্ন সেই ছোটবেলায় শুনেছিলাম, এতোদিন পর পিএইচডির শেষ লগ্নে এসে আবার এই প্রশ্নটার সম্মুখীন হতে হলো -- "পিএইচডির পর কি করবে ভাবছো: Post-doc, faculty না industry?"

বিদেশে গিয়ে Post-doc করার মতো বান্দা আমি নই -- ঘরের থেকে অতদূরে গিয়ে, নিজে রান্না-বান্না করে, অফিসে (থুড়ি, ল্যাবে) সারাদিন ঘাড় গুঁজে কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। (এখানে খাওয়া-দাওয়া, লন্ড্রি, বাজার -- এসব কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না, তাতেও বলে কাজ করতে পারি না আর ওখানে গেলে কিনা কাজ করে ফাটিয়ে দেব, এমনটা হয় নাকি?)

তাহলে হাতে রইলো ফ্যাকাল্টি আর ইন্ডাস্ট্রি। ফ্যাকাল্টি হতে গেলে কিছু গুণ থাকা আবশ্যক যেগুলো আমার মধ্যে বোধহয় নেই। যেমন ধরুন, মাথা ঠান্ডা রাখা -- আমার ধারণা আমার অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়; আর শিক্ষকের সহজে মাথা গরম হয়ে গেলে ছাত্ররা যে কতরকম ভাবে তার পেছনে লাগে সে অভিজ্ঞতা কম বেশী আমাদের সকলেরই আছে। তাছাড়া কোনো বিষয় পড়াতে গেলে সেটা ছাত্রদের মনোগ্রাহী করে পড়ানো উচিৎ যা অধিকাংশ শিক্ষকই পারে না। এই নিয়ে একটা ঘটনা বাবার কাছে শুনেছিলাম।

স্টেট ব্যাঙ্কে চাকরি পাওয়ার পর বাবাকে অনেক বিষয় ট্রেনিং-এর সময় পড়তে হয়েছিলো। তার মধ্যে একটি ছিল -- আইন। বাবাদের একজন আইনের টিচার ক্লাসে এসে প্রথমেই বললেন: "আইন খুব জটিল বিষয়, আমি যা যা বলছি সব খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে নোট করে রাখবে।" এই স্যারের ক্লাস ছিল ভীষণ একঘেয়ে।
কিছুদিন পর আরেকজন স্যার আইন পড়াতে আসেন, তিনি প্রথমেই বলেন: "আইন খুব ইন্টারেস্টিং সাবজেক্ট, আমি যা বলছি সব যুক্তির সঙ্গে ভাববে -- তাহলেই দেখবে বিষয়টা বেশ সহজ।" ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়ার জন্যে তিনি একটি উদাহরণ দেন -- একবার ভারতে নতুন নিয়ম করা হয় যে কোনো দেবতার মন্দির দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে দশ কাঠার বেশী রাখতে পারবে না, তার অধিক জমি থাকলে সরকার তা অধিগ্রহণ করবে। এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর রাধা-কৃষ্ণের একটি মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাদের দাবি যেহেতু মন্দিরে দুইজন দেব-দেবীর পুজো হয় তাই তাদের প্রাপ্য বিশ কাঠা জমি সরকারকে ছেড়ে দিতে হবে। সরকার পক্ষের উকিল যুক্তি দেখান যে হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী (হিন্দু দেবতা যখন, তখন হিন্দু আইন-ই প্রযোজ্য) স্বামী-স্ত্রীকে আলাদা আলাদা দাবিদার বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না, তাই রাধা-কৃষ্ণের মন্দিরের দশ কাঠা জমিই প্রাপ্য। এই শুনে বাদী পক্ষের উকিল কোর্টে পণ্ডিতকে ডেকে শাস্ত্র খুলে দেখিয়ে দেন শাস্ত্রে কোথাও রাধা কৃষ্ণের বিয়ের কথা লেখা নেই, অর্থাৎ সরকার পক্ষের উকিলের যুক্তি ধোপে টিকবে না। শেষ পর্যন্ত, এই মামলায় মন্দির কর্তৃপক্ষই জয়ী হন।
সেই স্যার আরেকটি মজার মামলার কথা বলেছিলেন। হিন্দু, মুসলমান আর শিখ -- তিনটি সম্প্রদায়ই কোর্টে মামলা করেছে হনুমান কোন ধর্মাবলম্বী এই বিবাদের সমাধান করতে; সকলেরই দাবি হনুমান তাদের ধর্মের একজন। হিন্দুর যুক্তি: হনুমানের কথা কোন বইয়ে লেখা আছে -- রামায়ণ, এটি যেহেতু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ তার মানে হনুমানও হিন্দু। মুসলমানের যুক্তি: মুসলিম নাম কি ধরণের হয় -- উলেমান, সুলেমান, ঠিক সেরকমই ছন্দ মিলিয়ে হনুমান, নাম থেকেই মালুম হচ্ছে হনুমান মুসলমান। শিখের যুক্তি: নাম দিয়ে কারো বিচার করা উচিৎ, বিচার করা উচিৎ তার কাম দিয়ে; লঙ্কায় যখন হনুমানের ল্যাজে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হলো তখন পাশে এতো বড়ো সমুদ্র থাকতেও হনুমান নিজের ল্যাজের আগুন কিভাবে নেভালো -- না, নিজের মুখের মধ্যে ল্যাজ ঢুকিয়ে দিয়ে, এমন কাজ একমাত্র পাঞ্জাবিদের পক্ষেই সম্ভব। এই মামলার শেষ পর্যন্ত কি নিষ্পত্তি হয়েছিল তা অবশ্য আমার জানা নেই।    

যাই হোক, আমি ভাবছি ইন্ডাস্ট্রি জয়েন করবো -- এখনো দেরি আছে অবশ্য, আরেকটু ভেবে দেখি।

No comments: