Friday, May 30, 2014

আমাদের হোস্টেলে Hall Day উপলক্ষে বাৎসরিক একটি ম্যাগাজিন বের করা হয় -- Sphota। তারই দ্বিতীয় এডিশনে (২০১০-২০১১) আমার নিম্নলিখিত গল্পটি প্রকাশ পায়। সামান্য পরিমার্জিত করে এখানে দিয়ে দিলাম, আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে।

"গুণধর"

রজনীকান্ত পড়েছে বিশাল বিপদে। পরীক্ষা শুরু হয়েছে এক ঘণ্টা হতে চললো, কিন্তু এখনও সে খাতায় একটা দাগ পর্যন্ত কাটতে পারলো না। অঙ্কে সে বরাবরই কাঁচা, তার উপর অ্যানুয়াল পরীক্ষার কোশ্চেনটাও হয়েছে হাফ-ইয়ারলির চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। অবশ্য হাফ-ইয়ারলির স্ট্যান্ডার্ডের হলেও রজনীকান্ত তাতে পাশ করতে পারতো না – কারণ, হাফ-ইয়ারলিতে অঙ্কে তার নম্বর ছিল মোটে ১২। অ্যানুয়ালে একটা ফাটাফাটি কিছু করে উঠতে না পারলে যে এ বছর তার আর পরের ক্লাসে প্রমোশন হবে না, তা রজনীকান্ত ভালো করেই জানে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতিও সে বরাবরের চেয়ে অনেক বেশি করেই করেছিলো। কিন্তু অঙ্ক যে তার মাথায় ঢোকে না মোটেই, অগত্যা… কথায় আছে – “আশায় বাঁচে চাষা”। তাই, তেত্রিশ কোটি দেবদেবীকে স্মরণ করে রজনীকান্ত পরীক্ষা হলে ঢুকেছিলো, যদি দেবকৃপায় তার একটা হিল্লে হয়ে যায়। কিন্তু তাঁরা যে এভাবে ভক্তকে ফেলে পিঠটান দেবেন তা কে জানতো?

অনেকের মনে হতে পারে যে রজনীকান্ত বুঝি মন দিয়ে পড়াশোনা করে না, একই ক্লাসে বার কয়েক গাড্ডু খায় – কিন্তু এমনটা মোটেই নয়। ক্লাস সিক্স থেকে সেভেনে সে ফার্স্ট হয়ে উঠেছে। তাই যখন সে হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষায় অঙ্কে ১২ এবং অন্যান্য সাবজেক্টে  তথৈবচ নম্বর পেল, তা দেখে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, রজনীকান্তের বাবা-মা, সহপাঠীরা, সকলেই বেশ অবাক হয়। অনেকে ভাবে ফার্স্ট হয়ে রজনীকান্ত পড়াশোনাকে হেলাফেলা করছে। আসল কারণটা যে ঠিক কি, তা কেউ বুঝতে পারেনা। রজনীকান্ত নিজের সাফল্যের রহস্য ভালো করেই জানে, তাই সে কিছুটা শক্ড হলেও সারপ্রাইজ্ড নয় মোটেই। ক্লাস সিক্সে ওর পরীক্ষা এতো ভালো হবে যে একেবারে প্রথম হয়ে যাবে, তা যদি আগে থেকে জানতে পারতো, তাহলে অত ভালো পরীক্ষা সে কখনোই দিত না। প্রয়োজন মতো ইচ্ছে করে কিছু উত্তর বা বানান ভুল করে আসতো। শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট হওয়াটাই রজনীকান্তের কাল হল।

রজনীকান্ত ক্লাস থ্রি ফোর থেকে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করে আসছে। কিন্তু ক্লাসের টপার সে গতবছর পরীক্ষার আগে কখনোই ছিল না। রজনীকান্ত এককালে পড়াশোনা করতো বেশ মন দিয়েই, কিন্তু শত চেষ্টাতেও পড়া কখনোই তার ঠিকমতো তৈরি হতো না। তাই ক্লাস থ্রির অ্যানুয়াল পরীক্ষায় খানিকটা মরিয়া হয়েই রজনীকান্ত তার সামনে বসে থাকা অর্ণবের খাতা থেকে টোকা শুরু করে। না, টুকলি করতে রজনীকান্তের বিশেষ একটা অসুবিধা পোয়াতে হয়নি। বরং ব্যাপারটা তার বেশ সহজ বলেই মনে হয়। অর্ণব কোনো উত্তরে আটকে গেলে, অর্ণবকে ছাড়িয়ে রজনীকান্তের দৃষ্টি চলে যায় অর্ণবের সামনে বসে থাকা সুস্মিতের খাতার দিকে। সুস্মিতের সামনে বসা রমেশের খাতার সূক্ষ্ম হাতের লেখা পড়তেও বিশেষ বেগ পেতে হয়না রজনীকান্তের। আগামী পরীক্ষাগুলিতে রজনীকান্ত সহজাত প্রতিভায় অনায়াসেই দক্ষতা লাভ করে। ক্রমশ সে নিজের কর্মক্ষমতার আরও উন্নতি ঘটায়। এখন আর তাকে খাতায় লেখা অক্ষরগুলো পড়তে হয়না – সহপাঠীদের পেন ধরা, হাত চালানো দেখেই কে কি লিখছে, রজনীকান্ত নির্ভুল আন্দাজ করে নিতে পারে। অবশ্য আন্দাজ যদি নির্ভুল হয়, তবে তাকে কি আর আন্দাজ বলা যেতে পারে?

রজনীকান্তের স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রত্যেক বছর রোল নাম্বার নির্ধারণ করা হয় তাদের বর্তমান পরীক্ষায় অর্জিত স্থানের ওপর ভিত্তি করে। আর, পরীক্ষার সময় তাদের বসানোও হয় এই রোল নাম্বার অনুযায়ী। তাই আজ রজনীকান্তের এই দশা। প্রত্যেক বছর সে পেছনের সারি থেকে ধাপে ধাপে সামনে এগিয়ে এসেছে। আর গত বছর প্রথম হওয়ার ফলে এবছর প্রথম বেঞ্চটা তার জন্যেই নির্ধারিত। এ মুহূর্তে রজনীকান্তের সামনে যিনি বসে আছেন, তিনি তাদের ক্লাস টিচার মৃত্যুঞ্জয়বাবু – ভারী গম্ভীর লোক, কোনরকম বেয়াদবি সহ্য করেন না। ডায়াসের উপর নিজের চেয়ারে বসে তিনি সকলের ওপর কড়া নজর রেখে চলেছেন। হাফ-ইয়ারলির রেজাল্ট তো সবাই জানেই! অ্যানুয়ালের রেজাল্টও যদি অনুরূপ হয়, তাহলে রজনীকান্তের ক্লাস সেভেনে থেকে যাওয়া ঠেকায় কে? ফার্স্ট বয় থেকে একেবারে ফেল বয়! ছিঃ ছিঃ, লজ্জার একশেষ। অবশ্য তারই মধ্যে সান্ত্বনার কথা একটাই যে, নিয়মানুযায়ী সেক্ষেত্রে রজনীকান্তের স্থান হবে একেবারে লাস্ট বেঞ্চে। মানে, একবারের বেশি দু’বার তাকে আর ফেল করতে হবে না। এইসব ছাইপাঁশ ভাবতে ভাবতে আরও আধঘণ্টা কেটে গেছে। তবুও একবারই বা ফেল করতে কে চায়? একটা শেষ চেষ্টা করলে হয়না?

রজনীকান্ত নিজের ঘাড়টা পিছনদিকে ঘুরিয়েছে কি ঘুরোয়নি, মৃত্যুঞ্জয়বাবু হেঁকে উঠলেন – "রজনীকান্ত, খাতা নিয়ে উঠে এসো।" যাঃ, আজ আর তবে নিস্তার নেই, নির্ঘাৎ ফেল। রজনীকান্ত খাতা পেন নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। মৃত্যুঞ্জয়বাবু নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন – "এখানে এসে বসো।" স্যারের হুকুম অমান্য করেই বা কি করে রজনীকান্ত, তার ঘাড়ে তো আর দু’টো মাথা নেই। আস্তে আস্তে স্যারের টেবিলে খাতা রেখে, চেয়ারে এসে বসে। রজনীকান্ত লক্ষ্য করে, সহপাঠীরা মিটিমিটি হাসছে। ফার্স্ট বয়কে হেনস্থা হতে দেখতে কার না ভালো লাগে? রজনীকান্তের দু’কান লাল হয়ে ওঠে। অবশ্য বসে থেকে লাভই বা কি? শেষ পর্যন্ত তো সাদা খাতাই জমা দিতে হবে, মনে মনে ভাবে রজনীকান্ত। কিন্তু একি? এখান থেকে তো সকলের খাতাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মানে, কে কি লিখছে, চেষ্টা করলেই বোঝা যায়। সাধারণতঃ যা দেখতে রজনীকান্ত অভ্যস্ত, উল্টোদিক থেকে তা একটু কষ্টকর; কিন্তু কথাতেই তো আছে – “কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলেনা।” নিজেকে মানিয়ে নিতে মিনিট খানেক সময় লাগে রজনীকান্তের। তারপরই তার হাত চলতে থাকে দ্রুতগতিতে।

No comments: